Follow by Email

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪

হাকিনী

হাকিনী
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর ( https://­­m.facebook.com/­­muhammad.toimoor?ref­i­d=52 )



পয়সাঅলা বাঙালি পরিবারগুলোর ব্যাপারে একটি প্রবাদ আছে। সেটি হলো এদের প্রথম পুরুষ কেনারাম, দ্বিতীয় পুরু ষ ভোগারাম, আর তৃতীয় পুরুষ বেচারাম। সোজা কথায় প্রথম পুরুষ টাকা বানাতে, জমিজমা কিনতেই জীবন হারাম করে ফেলে। দ্বিতীয় পুরুষ শুধু বসে বসে খায় আর ঘোরে। তৃতীয় পুরুষ সব বেচেকিনে শেষ করে। চতুর্থ পুরুষের বেলায় কী হয় তা অবশ্য বলা নেই। তবে সে যে বস্তিরাম হবে তা নিশ্চিত। আমাদের পরিবারে অবশ্য কেনারাম যে বেচারাম সেই-ই। এক পুরু ষেই সব উড়েপুড়ে শেষ। আমার বাবার ছিল তেজারতির ব্যবসা, যাকে বলে সুদের কারবার। জমিজমা-গয়না বন্ধক রেখে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়াই ছিল তার কাজ। প্রথম দিকে বাবা ছিলেন খুলনা শহরের এক মাড়োয়ারির দোকানের হিসাব লেখক। ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর সেই মাড়োয়ারি ব্যবসাপাতি গুটিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেল। সেই সাথে গেল বাবার চাকরিও। বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরতে লাগলেন। একদিন দুপুরে চার আনার বাদাম কিনে হাদিস পার্কের এক বেঞ্চের ওপর বসে কীভাবে আগামী মাসের ঘরভাড়া দেবেন ভাবতে লাগলেন সেই কথা। বাবা ভাড়ার কথা যখন ভাবছেন এবং মাঝেমধ্যেই উদাস হয়ে পার্কের গেটের সামনে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছেন তখন হঠাৎ তার চোখ পড়ল গেটের পাশে বটগাছের নিচে বসা এক জ্যোতিষীর ওপর। জ্যোতিষীর পাশে পার্কের রেলিংয়ে লাল সালুতে রুপালি রঙে লেখা :

জ্যোতিষ সাগর নেতাই নাথ
হাত দেখিয়া ভাগ্য গণনা করা হয়
দর্শনী ১২ আনা মাত্র।

মাঝবয়সী ঘোর সংসারী মানুষ অর্থকষ্টে পড়লে তার মাথার ঠিক থাকে না। চার আনার বাদাম কেনার পর বাবার সম্বল তখন একুনে বারো আনা। তিনি জ্যোতিষ সাগরকে দিয়ে ভাগ্য গণনা করালেন। নেতাই নাথ বাবাকে বললেন, ব্যবসার লাইনে বৃহস্পতি তুঙ্গে। চাকরির ক্ষেত্রে শনির বলয়ে কেতুর আনাগোনা। আগামী পঁচিশ বছরে শনির বলয় ছেড়ে কেতুর অন্য কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা জিরো পার্সেন্ট। জ্যোতিষ সাগরকে হাত দেখানোর আগে বারো আনাই অ্যাডভান্স করতে হয়েছে। বাবার দুবছরের পুরোনো রংজ্বলা ক্রিজভাঙা প্যান্টের পকেট তখন গ্যাস বেলুনের মতো হালকা। বাসায় শ'খানেক টাকা মা'র কাছে আছে। শেষ সম্বল। ব্যবসা কীভাবে হবে বুঝতে পারছেন না। তিনি জ্যোতিষ সাগরকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসের ব্যবসায় উন্নতির সম্ভাবনা। জ্যোতিষ তাঁকে তেজারতির ব্যবসা ধরতে বলল। সাফল্যের পরিমাণ শতভাগ। আগেই বলেছি, ছাপোষা মানুষ বিপদে পড়লে মাথার ঠিক থাকে না। বাবা চলে গেলেন ঘোরের ভেতর। বাস করতে লাগলেন এক মানসিক কোমায়। বাসায় ফিরে মাকে বললেন,
'বিমলা, চাকরি তো অনেক দিন করলাম। এবার ভাবছি ব্যবসা-বাণিজ্য করব।'
মা বললেন, 'আচ্ছা, তা না হয় করবেন। কিন্তু আপনার পুঁজি কোথায়?'
'তোমার বড় ভাইয়ের তো বিরাট অবস্থা। তার কাছ থেকে হাজার দশেক এনে দাও। এক বছরের ভেতর শোধ হয়ে যাবে।'
'আর যদি শোধ দিতে না পারেন, তখন?'
'না পারলে তোমার বাবার সম্পত্তির যে অংশ তুমি পাবে ওটা তার হবে।'
'ওইটুকুই তো সম্পত্তি। হাতের পাঁচ। ওটা গেলে আর থাকল কী? পথে পথে ভিক্ষে করে খেতে হবে।'
'অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে পথে পথে ভিক্ষে তো মনে হয় কাল থেকেই করতে হবে। যা বলি মন দিয়ে শোনো। তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে টাকাটা এনে দাও। মাড়োয়ারির দোকানটা এখনো খালিই আছে। আপাতত ওখানেই বসা যাবে। নতুন মালিককে মাঝে মাঝে কিছু ভাড়া দিলেই হলো।'



সেই থেকে শুরু। দশ বছরে বাবা প্রায় ত্রিশ লাখ টাকার মালিক হয়ে গেলেন। সুদের কারবারে সাধারণত যা হয়। আসল শোধ দিতে পারলেও সুদ থাকে। যদি সুদ শোধ হয় তো আসল থাকে। এগোলেও নির্বংশের ব্যাটা, পেছালেও নির্বংশের ব্যাটা। খাতকদের কাউকেই ছ'মাসের বেশি সময় বাবা দিতেন না। এর ভেতর আসলসহ সুদের টাকা শোধ না হলে বন্ধকী সম্পত্তি কিংবা গয়না বাজেয়াপ্ত হতো। নিয়মানুযায়ী সুদসহ আসল কেটে রেখে সম্পত্তি বা গয়না বিক্রির উদ্বৃত্ত টাকা খাতককে দেওয়ার কথা। বাবা দিতেন না। বিশেষ করে, অসহায় বিধবা, এতিম অথবা অন্য জেলার লোকদের বেলায়। তার পোষা কিছু গুন্ডাপান্ডা ছিল। কেউ প্রতিবাদ করতে এলে তাদেরকে এরা ভাগিয়ে দিত।


বাবা যখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন, দুটি বাড়ি কেনার পর তিন নম্বর বাড়ির বায়না করবেন বিপদ ঘটল ঠিক তখন। পৌষ মাসের এক মেঘলা দিনে সন্ধেবেলা অশীতিপর এক বৃদ্ধা রিকশা থেকে তার দোকানের সামনে নামল। মহিলা কালীঘাটে পুরোনো এক বাড়িতে থাকে। দুটো বালা বন্ধক রেখে টাকা ধার করতে চায়। বালা দুটো হাতে নিয়ে খুব ভালো করে পরীক্ষা করলেন বাবা। পুরোনো জিনিস। আদ্যিকালের ডিজাইন। তবে জিনিস ভারী। দুটোতে কম করে হলেও পাঁচ ভরি সোনা আছে। বর্তমান বাজারদরে ওগুলোর দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা হওয়ার কথা। বাবা বললেন,
'ওগুলো রেখে পাঁচশো টাকা নিয়ে যান। ছ'মাসের ভেতর সাতশো পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বালা ফেরত নিয়ে যাবেন। দেনা পরিশোধ করতে না পারলে মাল বাজেয়াপ্ত হবে।'

বুড়ি কাগজে টিপ সই দিয়ে টাকা, রশিদ নিয়ে কালীঘাটে ফিরে গেল। ছ'মাস পার হলো। বুড়ির দেখা নেই। বাবা বালা দুটো বাসায় এনে তার শোবার ঘরে সিন্দুকে রেখে দিলেন। তখন ১৯৭৫ সাল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া জাতীয় গণতান্ত্রিক দল বা জাগ দল নামে নতুন দল গঠন করেছেন। সেই দলের উঠতি নেতাদের সাংঘাতিক দাপট। এইরকম এক নেতা যার নাম মোটা মোসলেম বাবাকে বলল দোকান ছেড়ে দেওয়ার জন্য। মাড়োয়ারির ওই দোকান অর্পিত সম্পত্তি। ভেস্টেড প্রপার্টি। সরকারের কাছ থেকে নিরানব্বই বছরের লিজ নিয়েছে সে। কাগজপত্র আপটুডেট। বাবা বললেন, দোকান তার দখলে। আগের মালিকের কাছ থেকে তিনি কিনে নিয়েছেন। কাগজপত্র তারও আছে। বাবা যেমন বুনো ওল নেতাও তেমন বাঘা তেঁতুল। গন্ডগোল চরমে উঠল। নেতা বুঝল হুমকি-ধামকিতে কাজ হবে না। সে ধরল অন্য রাস্তা। থানার ওসিকে হাত করে দুটো মার্ডার কেসে বাবার নাম ঢুকিয়ে দিল। এর একটিতে তার পোষা গুন্ডাপান্ডার একজনকে বানাল রাজসাক্ষী। ভালো রকমের জটিল মামলা। টুটপাড়ার এক হিন্দু বিধবার নাতি খুন হয়েছিল। পুরোপুরি বখে যাওয়া এই নাতির বাবা-মা থাকত কলকাতায়। বিরাট বাড়িতে দিদিমা একা। কলকাতার ছোট্ট খুপরি বাসায় দাদিমার দম বন্ধ হয়ে আসে। নাতির কাজ কলেজে পড়াশুনো করা, দিদিমাকে দেখে রাখা। এই দুটোর কোনোটাতেই তার আগ্রহ ছিল না। তার সব আগ্রহ জুয়া, মদ, বাজে মেয়েমানুষে। দাদির গয়নাপাতি বন্ধক রেখে বাবার কাছ থেকে প্রায়ই টাকা ধার নিত নাতি। কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখা গেল, প্রায় বিশ হাজার টাকার গয়না বন্ধক রেখে বাবা তাকে দিয়েছেন মাত্র দুহাজার। খুনের মোটিভ 'পরিষ্কার'।

বাবার ঠাঁই হলো জেলহাজতে। কেস চলল মাসের পর মাস। থানা, পুলিশ, কোর্ট-কাছারি, উকিল-মোক্তার করতে গিয়ে টাকা খরচ হতে লাগল হু হু করে। সুদখোরকে কেউ পছন্দ করে না। আমরা কারও সহানুভূতি পেলাম না। যেখানে পাঁচশোতে কাজ হওয়ার কথা, সেখানে দিতে হয় হাজার টাকা। ক্যাশ যা ছিল গেল। এরপর গেল জমিজমা, বাড়িঘর। বাবা হাজত থেকে আর বেরোতে পারলেন না। সাজানো মামলায় ফাঁকফোকর কম। উকিল সাহেব প্রথম প্রথম বলতেন, আগামী হেয়ারিংয়েই বেইল হবে। এখন কিছুই বলেন না। একদিন চেম্বারে অপেক্ষা করছি। উকিল সাহেব কোথায় যেন গেছেন। তার মুহুরি আস্তে করে বলল,
'মনে হয় কনভিকশন হয়ে যাবে।'

এদিকে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। একদিন সকালে বসে ডায়েরি লিখছি, শোবার ঘরের সিন্দুক খুলে সেই পুরোনো বালা দুটো বের করে মা বললেন,
'দেখ তো সঞ্জয়, এগুলো বেচা যায় কি না?'


খুলনার সবচেয়ে বড় সোনার দোকান অমিয় জুয়েলার্স। মন্ময় চৌধুরী দোকানের মালিক। বিরাট ধনী লোক। কারও সাথে মেশেন না। দোকানের কাউন্টারে বালা দুটো রেখে সেলসম্যানকে বললাম, এগুলো আমি বেচতে চাই। সেলসম্যান প্রথমে খুঁটিয়ে দেখল। কষ্টিপাথরে ঘসে সোনার মান যাচাই করল। সবশেষে নিল ওজন। তারপর বলল,
'এ দুটোতে পাঁচ ভরি সোনা আছে। অনেক টাকার ব্যাপার। মালিককে দেখাতে হবে।'
'ঠিক আছে, দেখান আপনার মালিককে।'
ভেতরে চলে গেল সেলসম্যান। পাঁচ মিনিট পর ঘুরে এসে বলল,
'আপনাকে আমরা এ দুটোর জন্য পাঁচ হাজার পর্যন্ত দিতে রাজি আছি। দোকানে এত ক্যাশ নেই। সাহেব বলেছেন, এখন আড়াই হাজার দিতে। বাকিটা সন্ধ্যার পর আসলে পাবেন। কী করবেন দেখেন?'

সত্যি বলতে কী তিন হাজারের বেশি আমি আশাই করিনি। সেই তুলনায় পাঁচ হাজার অনেক বেশি। বললাম,
'ঠিক আছে, সন্ধের পর এসে বাকিটা নিয়ে যাব। একটা রশিদ লিখে দেন।'

সন্ধের পর আবার গেলাম অমিয় জুয়েলার্সে। আগের সেলসম্যান কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত। বুড়োমতো একজন এগিয়ে এল। বলল,
'আমি দোকানের ম্যানেজার। সাহেব আপনার সাথে দুমিনিট কথা বলতে চান। টাকাটা উনিই আপনাকে দেবেন। আমার সাথে একটু ভেতরে আসেন।'

কাউন্টার পার হয়ে শোকেসের পাশে সরু দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। বিরাট হলঘরের মতো কামরায় আবছা অন্ধকারে স্যাঁকরার দল লাইন দিয়ে বসে কাজ করছে। নাইট্রিক এসিডের ঝাঁঝালো গন্ধে দম বন্ধ হয়ে এল। লোকগুলো বছরের পর বছর এই পরিবেশে কাজ করছে কী করে? পেতলের সরু পাইপ মুখে লাগিয়ে গয়নার গায়ে অনবরত ফুঁ দিচ্ছে তারা। গাল ফুলে উঠেছে শ্রাবণ মাসের কোলা ব্যাঙের মতো। ফুসফুস এত চাপ সহ্য করে কীভাবে! হলঘর পেরিয়ে লাল কার্পেট মোড়া ছোট একটি প্যাসেজের মাথায় কাচ লাগানো সেগুন কাঠের দরজা। নক করে ম্যানেজার আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল।

প্রকাণ্ড জানালাঅলা ঝকঝকে কামরা। দেয়ালের একদিকে রেমিংটন কোম্পানির ইয়া বড় সিন্দুক। এই জগদ্দল পাথরের মতো ভারী বস্তু দোতলায় যে কারিগর উঠিয়েছে, তাকে অভিনন্দন। অন্য দেয়ালের পুরোটা জুড়ে বইভর্তি কাচের শোকেস। মন্ময় চৌধুরী আমার দিকে তাকালেন। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের 'কিনু গোয়ালার গলি' কবিতার কথা। 'যত্নে পাট করা লম্বা চুল। বড়বড় চোখ। শৌখিন মেজাজ। কর্নেট বাজানো তার শখ।' পার্থক্য শুধু এই যে ইনার চুলগুলো ধবধবে সাদা। ছড়িয়ে আছে ঘাড়ের ওপর। ইস্ত্রি করা ফিনফিনে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা। তবে ইনি যন্ত্র শিল্পী কি না বুঝতে পারছি না। ধারণা করেছিলাম, কালো মোটা ফতুয়া পরা ধূর্ত চেহারার কাউকে দেখতে পাব। মন্ময় চৌধুরী দেখতে রবীন্দ্রনাথের মতো। সাধক-টাইপ চেহারা। এই লোকের লেখালেখি করার কথা। মাঝে মাঝে সভাসমিতিতে বক্তৃতা। কাগজে কাগজে ইন্টারভিউ। মনোযোগ দিয়ে পুরোনো আমলের একটি ক্যাটালগ দেখছেন মন্ময় চৌধুরী। ইশারায় বসতে বললেন।
'আপনি সঞ্জয় বাবু?' গভীর কালো চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন ম. চৌধুরী।
'আজ্ঞে, আমিই সঞ্জয়।'
'বালা দুটো পেলেন কোথায়?'
কোনো কিছু গোপন না করে তাঁকে সব ভেঙেচুরে বললাম।
'বুড়ির বাড়ির ঠিকানা কি আছে আপনার কাছে?'
'ছিল তো বটেই। তবে পুলিশ খাতাপত্র সব জব্দ করে মালখানায় রেখেছে। এখন আর সেটা পাব কীভাবে?'
'হুমম, বুঝতে পারছি। একটা প্রশ্ন করি। কিছু মনে করবেন না তো?'
'সেটা বোঝা যাবে প্রশ্ন শোনার পর। কী প্রশ্ন? বুড়ির বাড়ি গিয়ে ভেরিফাই করতে চান, আমি সত্যি বলছি কি না এইতো? তার প্রয়োজন নেই। আমি সত্যি কথাই বলছি। মিথ্যে বললে আপনি ধরে ফেলতেন।'
'ব্যাপারটা তা নয়। বুড়ির সাথে একটু কথা বলতে চাই আমি। বালা দুটো তার কাছে আসলা কীভাবে, সেইটে জানতে চাই। আপনি বলেছেন বুড়ি থাকে কালীঘাটে। এটাই বা জানলেন কীভাবে? খাতাপত্র মালখানায়। বাবা জেলহাজতে। বালা দুটো হাতে পেয়েই আপনি আমার এখানে।'
'মার কাছ থেকে জেনেছি। দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা গয়নাপাতি বাসায় আনতেন খুব কম। পুরোনো গয়না মাকে কখনো দেননি। নতুন বানিয়ে দিতেন। বালাগুলো একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। বাবাকে জিজ্ঞেস করে মা জানতে পারেন কালীঘাটের এক বুড়ির গয়না ওগুলো। আপনি যদি বুড়িকে খুঁজে বের করতে পারেন, তাহলে বলবেন। কিছু টাকা তাকে ফিরিয়ে দিতে চাই আমি।
'আপনার কোনো ফোন নম্বর থাকলে আমাকে দিয়ে যান। খোঁজ পেলে জানাব।'
লক্ষ করলাম, কথা বলার পুরো সময়টাতেই ম্যানেজার ঠায় দাঁড়িয়ে। বুঝলাম, কর্মচারীরা মন্ময় চৌধুরীকে খুব সমীহ করে। ভাবুক ধরনের এই মানুষটাকে এরা এত ভয় পায় কেন কে জানে?


পরদিন কোর্টে বাবার হেয়ারিং ছিল। সাবজজ-১-এর কোর্টে কেস। বিশ-পঁচিশটা ফৌজদারি মামলার শুনানি হবে। কার কেস কখন উঠবে আগে থেকে বলার উপায় নেই। অফিস সকাল ন'টায় শুরু হলেও জজ সাহেব এগারোটার আগে এজলাসে ওঠেন না। কেসের শুনানি চলে একটানা বিকেল চারটে অব্দি। এর ভেতর লাঞ্চ ব্রেক, নামাজের ওয়াক্ত এসব আছে। সকাল ন'টার ভেতরই জেল থেকে প্রিজনভ্যানে সব আসামি এনে পুলিশেরা কোর্ট-হাজতে রাখে। দশ টাকা, বিশ টাকা দিলে হাজতিকে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়াতে দেয় তারা। আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা হয়। দর্শনার্থীদের ভেতর গ্রামের বৌ-ঝিরাই বেশি। কোলে-কাঁখে দু-তিনটা ছেলেমেয়ে। সিকনি গড়িয়ে পড়ছে বাচ্চাগুলোর নাক দিয়ে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে এর খানিকটা গালেও মেখেছে তারা। শুকিয়ে চড়চড় করছে গাল। সব কটার পা খালি। এদের মায়েদের স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা ধুলোভরা পা দেখে এত মন খারাপ হয়! একটা ছোট ছেলে তার হাজতি বাবাকে বলছে, 'আব্বা, আমাকে একটা পাউরু টি কিনে দেন না।' শহরের মানুষের কাছে পাউরু টি কিছু না। গ্রামের মানুষের কাছে ওটা স্বপ্নের খাবার। আমাদের গাঁয়ের একটি খুব বুড়ো লোককে চিনতাম। অনেক দিন থেকেই রোগে ভুগছিল। মরণ ঘনিয়ে এসেছে বুঝতে পেরে মেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আব্বা, কী খেতে মন চায়?' 'আমাকে একটা পাউরু টি খাওয়াতি পারবি?' জবাব দিলেন বাবা। গ্রাম থেকে রেলস্টেশন সাতাশ মাইল দূরে। পাউরু টি পাওয়া যায় শুধু সেখানেই। পায়ে হেঁটে একজন রওনা হলো পাউরু টি আনতে। পরদিন বাসি পাউরু টি এসে যখন পৌঁছাল বুড়ো তখন পরপারে। একটা পাউরু টির দাম ষাট পয়সা। বাবার চোখ ছলছল করছে। তার কাছে এক টাকাও নেই।

আগেই বলেছি, কার কেস কখন উঠবে বলা যায় না। এ হচ্ছে 'শেষ পুরোহিত কঙ্কালের পাশা খেলা।' সাক্ষী-সাবুদ, আসামি সব বসে আছে সকাল থেকে। উকিলরা দু-তিনটা কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করছে। আরিচা ঘাটে ফেরি-ধরা টেনশন। কোর্টে কেস উঠল। সত্য-মিথ্যা সব সাক্ষী রেডি। আসামি হাজির। জজ সাহেব অপেক্ষা করছেন। উকিলের দেখা নেই। কিছুক্ষণ দেখে জজ সাহেব সে কেস বাদ দিয়ে আরেকটি ধরলেন। নেঙ্ট হেয়ারিং ডেট তিন সপ্তাহ পরও পড়তে পারে, দু মাস পরও পড়তে পারে। আসামি আবারও প্রিজনভ্যানে। গন্তব্য কারার ঐ লৌহকপাট। কার গোয়ালে কে দেয় ধুঁয়ো। বাবার কেস ওঠা নিয়ে রাশিয়ান রু লেত খেলা চলে না। পেশকারকে দুশো টাকা দিয়েছি। প্রথমেই যাতে বাবার কেসটা জজ সাহেবের হাতে ধরিয়ে দেয় সে। হেয়ারিং হলে আরও পঞ্চাশ। উকিলকে ধরে এনে বসিয়ে রেখেছি। তিনজন সাক্ষীকে একশো টাকা করে দিতে হয়েছে। ভালো হোটেলে গোস্ত-পরটা খেয়েছে সকালে। কোর্টে এসে চা, পান, সিগারেট। মুহুরিকে বিশ টাকা দিয়ে হাজিরা জমা করে বসে আছি। ওপারের ডাক যদি আসে। দুহাত বুকের সমানে জড়ো করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বাবা। হাতে বেড়ি, পায়ে বেড়ি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। ক্ষুদিরামের খালু। তাকিয়ে আছেন জানালার বাইরে ড্রেনের ধারে কচুগাছের দিকে। মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে! পয়সাঅলা মানুষদের চেহারায় যে তেলতেলে ভাব থাকে তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই তার ভেতর। উকিল একবার উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'ধন বাবু (বাবার নাম ধনঞ্জয়), ভালো তো?' বাবা পাত্তাও দিলেন না। তার চোখে সক্রেটিসের উদাসীনতা। পাথরের বাটিতে কখন হেমলক পরিবেশন করা হবে তার অপেক্ষা।

বাবার কেস উঠল ঠিকই তবে হেয়ারিং হলো না। মোটা মোসলেম আসেনি। জাগ দলের জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় গেছে। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত। তার উকিল টাইম প্রেয়ার দিয়েছে। পরের হেয়ারিং ডেট পড়ল তিন সপ্তাহ পর। ছোট্ট টিফিন ক্যারিয়ারে বাবার জন্য ইলিশ মাছ ভাজি, লাউ দিয়ে রান্না মাস কলাইয়ের ডাল পাঠিয়েছিলেন মা। এক জেল পুলিশকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বললাম টিফিন ক্যারিয়ারটা বাবাকে দিতে। পুলিশ বলল, 'জেলে গিয়া দিমুআনে।' শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা পুলিশ আজও পেলাম না।

পরদিন দুপুরে খেয়ে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়েছি। বাইরে শুরু হলো বৃষ্টি। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। মা ঘুম ভাঙিয়ে বললেন অমিয় জুয়েলার্স থেকে ফোন এসেছে। চৌধুরী সাহেব সন্ধের সময় দোকানে দেখা করতে বলেছেন। বুড়ির বাসার ঠিকানা পাওয়া গেছে।


রিকশা করে আমাকে সাথে নিয়ে রওনা হলেন চৌধুরী বাবু। কালীঘাট এলাকায় আগে কখনো আসিনি আমি। সরু রাস্তার দুপাশে পুরোনো সব টিনের বাড়ি। অনেকেই ধুনুচি জ্বালিয়ে সন্ধ্যা আরতি দিয়েছে। বাতাসে ধূপধুনোর গন্ধ ম ম করছে। সরু গলির মাথায় ছোট ছোট ইটে গাঁথা আদ্যিকালের বাড়ি। পলেস্তারা খসে ইট বের হয়ে সেই ইট পর্যন্ত ক্ষয়ে গেছে। চারদিকে ভাঙাচোরা ইটের স্ত্মূপ। মানগাছ, কচুগাছের ঝোপ। এর মাঝে দুখানা মাত্র ঘর কোনোরকম টিকে আছে। ছোট জানালায় চটের পর্দা ঝুলছে। ভেতরে কুপি জ্বলছে বলে মনে হলো। এ বাড়িতে কারেন্টের কারবার নেই। সামনেই সরু কাঠের দরজা। বারান্দা-সিঁড়ি এসবের কোনো বালাই নেই। কোনো কালে হয়তো ছিল। ঢোকার সরু দরজাটা পুরোনো ভাঙাচোরা হলেও এর জটিল নকশা দেখে বোঝা যায়, একসময় কত সুন্দর ছিল ওটা। দরজার ওপরে শেকল, মাঝে দুটো কড়া। খুব জোরে কড়া নাড়লেন চৌধুরী সাহেব। বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, বুড়োরা কানে কম শোনে। প্রায় সাথে সাথেই মাঝবয়সী শ্যামলা এক ভদ্রলোক দরজা খুললেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, গলায় কাঠের মালা। কামানো মাথার পেছনে ছোট একটা টিকি ঝুলছে। দেখেই বোঝা যায়, মন্দিরের পুরুত ঠাকুর। ভদ্রলোক বের হচ্ছিলেন বোধ হয়।
'আজ্ঞে, আপনারা?' কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন পুরুত।
'আমার নাম মন্ময় চৌধুরী। অমিয় জুয়েলার্স থেকে আসছি। আমরা কাদম্বিনী দেবীর কাছে এসেছি।'
'আমি ওর নাতজামাই। তেনার শরীরটা খারাপ। কী দরকার জানা যাবে?'
'উনি কিছু টাকা পাবেন। দেওয়ার জন্য এসেছি', বললাম আমি।
'আপনারা বসেন। দেখি কী করা যায়?'
ঘরের মেঝে স্যাঁতসেঁতে। নোনা ধরা দেয়াল। পায়া ভাঙা শাল কাঠের চকির ওপর পাটি বিছানো। পুরু ধুলো জমে আছে ওপরে। কড়ি-বর্গা দেওয়া ছাদ থেকে আগের আমলের শেকলে বাঁধা ঝাড়লন্ঠন ঝুলছে। ঝুলকালিতে দেখতে হয়েছে কাকের বাসা। বুড়ি ওটাকে এত দিন বেচে দেয়নি কেন? যেভাবে লোহার শেকল দিয়ে বাঁধা তাতে নামানোর পারিশ্রমিক বিক্রীত মূল্যের চেয়ে বেশি হবে। ঝাড়লন্ঠন বিলুপ্ত না হওয়ার পেছনে ওটাই প্রধান কারণ।

'ঠাম্মা বাতের ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছেন। উনি উঠে আসতে পারবেন না। আপনাকেই ওর কাছে যেতে হবে।' ফিরে এসে বলল পুরুত।
পুরুতের পেছন পেছন যে কামরায় এসে ঢুকলাম সেবা প্রকাশনীর বইয়ের ভাষায় সেখানে দারিদ্র্য 'মুখ ব্যাদান' করে আছে। বিমূর্ত দারিদ্র্য এখানে মূর্ত। পভার্টি ইজ আ কার্স। অভিশাপ নয়, এখানে পভার্টির গজব নাজিল হয়েছে। জরাজীর্ণ ছোট এক খাটের ওপর চাঁদিছিলা জাজিম। তুলো নারকোলের ছোবড়া এত কালো হয়ে বেরিয়ে পড়েছে যে ওগুলো তেলতেলে হয়ে গেছে। জাজিমের ওপর আঁশ ছেঁড়া শীতলপাটিতে শুয়ে আছে ফ্রানৎজ কাফকার 'দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট'। স্রেফ হাড়ের ওপর কোঁচকানো চামড়ার জীবন্ত বিভীষিকা। বুড়ির বয়সের গাছ-পাথর নেই। টি এস এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্টল্যান্ড' কবিতার দ্য সিবিল অভ ক্যুমা। ঘরের সিলিংয়ের নিচে পলিথিন টাঙানো। বৃষ্টি হলে ছাদ থেকে মনে হয় জল পড়ে। দেয়ালের এক কোণ ভেঙে ইট গেঁথে ড্রেনের মতো করা হয়েছে। বুড়ির বাথরুম। সেখানে এক বালতি পানিতে লাল রঙের প্লাস্টিকের মগ ভাসছে। খাটের পাশে চিলুঞ্চি। কফ, থুতু চিলুঞ্চির ভেতরে যত, বাইরে তার শত গুণ। ঢাকা শহরের ডিআইটি ডাস্টবিন। মনে হলো, ঘরের ভেতরে ভেসে আছে 'অনাদি কালের বিরহ বেদনা।' নাকে এসে লাগল গা গুলিয়ে ওঠা তীব্র আঁশটে গন্ধ। হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসলেন মন্ময় চৌধুরী। চেয়ার একটাই। পুরুত ঠাকুর বুড়ির মাজার কাছে বিছানায় বসেছে। আমি দাঁড়িয়ে।
'ঠাম্মা, উনার নাম মন্ময় চৌধুরী। আপনার সাথে আলাপ করতে চান।' শুরু করল পুরুত।
ছানিপড়া চোখ তুলে মন্ময় চৌধুরীর দিকে তাকালেন বৃদ্ধা। কিছু দেখতে পেয়েছেন বলে মনে হলো না। পকেট থেকে বালা দুটো বের করে বুড়ির দিকে এগিয়ে দিলেন মন্ময়। বললেন,
'দেখুন তো এগুলো চিনতে পারেন কি না?'
বালা হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখল বুড়ি। তারপর রিনরিনে অথচ স্পষ্ট করে বলল,
'চিনতে পেরেছি, বাবা। সারা জীবন ওগুলো নাড়াচাড়া করেছি। এর প্রতিটি ঘাট আমার মুখস্থ।'
'ওগুলো কে দিয়েছিল আপনাকে?'
'কেউ দেয়নি। মায়ের কাছে ছিল। মা মারা যাওয়ার আগে দিয়ে গেছেন। মায়ের দেওয়া জিনিস শত কষ্টের ভেতরও বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো কোথায়?'
'আপনার মা ওগুলো পেলেন কোথায়, সে ব্যাপারে কিছু জানেন?'
'আমার বাবা তাকে দিয়েছিলেন। সে অনেক কাল আগের কথা, বাবা। তখন এই শহরে অনেক সাহেব ব্যবসায়ী ছিল। এদের একজনের সাথে বাবার খাতির ছিল খুব। এই খুলনা শহরের নাম ছিল রোয়ালে বদেরপুর। রূপসা নদীর ধারে অনেক কাল আগের একটা মন্দির আছে। ওটা খুল্লনা দেবীর। ওর নাম থেকেই এই এলাকার নাম খুলনা। বাবা ওই মন্দিরের সেবায়েত ছিলেন। পরে এই বাড়িতে চলে আসেন। এই বাড়িটা আগে থেকেই ছিল। এর মালিক ছিল নানাভাই ধূনজী। কলকাতার ব্যবসায়ী। বিখ্যাত ধনী। আমার জন্ম এ বাড়িতেই। তখন আমাদের অবস্থা ভালো ছিল। মন্দিরে বাবা আর ফিরে যাননি। বাকি জীবন তন্ত্র সাধনা করে কাটিয়েছেন। ওই সাহেব প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন। দক্ষিণে আলাদা একটা ঘর ছিল। আমরা বলতাম কালীমন্দির। বাবার সাথে ওখানেই দেখা করতেন সাহেব।'
'সাহেবের নামটা বলতে পারবেন?' বুড়িকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মন্ময়।
আসল প্রশ্নের উত্তরের ধারেকাছেও বুড়ি এখনো আসেনি। হাজার এক রজনী গল্পের ভূমিকা একে দিয়ে লেখালে ভালো হতো।
'উনাকে সবাই ঠাকরে সাহেব বলে ডাকত। লাল টকটকে চেহারা। সারা গায়ে ভালুকের মতো লোম। খুব শক্তিমান পুরুষ। দেখলে ভয় হয়। এ বাড়িতে আসার কিছুদিন আগে বাবার ক্যাশ বাঙ্রে ভেতর মা ও দুটো দেখতে পান। ভীষণ অবাক হন ওগুলো দেখে। সোনার বালা নিজের কাছে কেন রাখবেন বাবা? গয়না আগলে বসে আছে এ-জাতীয় পুরু ষ বিরল। বাবা ওই গোত্রের লোক ছিলেন না মোটেও। এ ছাড়া মা'র এ-ও মনে হলো, ওগুলো আগে কোথাও দেখেছেন। আগের দিনে অনেকেই মূল্যবান জিনিস, সোনাদানা, টাকাপয়সা মন্দিরে জমা রাখত। কেউ কেউ প্রতিমাকে অনেক কিছু দানও করত। মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের জোড় মূর্তির পেছনে ছোট্ট একটা ঘরে ওগুলো জমা করে রাখা হতো। বছরে একবার বের করে হিসাব মেলানো হতো, ঝাড়পোঁছ করা হতো। এসব কাজে মাকেও সাহায্য করতে হয়েছে। সে সময়ই মা বালাগুলো দেখে থাকবেন। বাবাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন মা। বাবা বলেছিলেন, কয়েক দিনের জন্য বালাগুলো নিজের কাছে রেখেছেন। বিশেষ দরকার। পরে ফিরিয়ে দেবেন। ফিরিয়ে আর দেননি। আষাঢ় মাসে অমাবস্যার এক রাতে কালীমন্দিরে সাধনায় বসেন বাবা। রাতে তার কাছে মন্দিরে যাওয়া মানা ছিল। সকালে মা গিয়ে দেখেন বাবা মরে পড়ে আছেন। সবার ধারণা, সন্ন্যাস রোগে মারা গিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু মা বলতেন, অপঘাতে মৃত্যু হয় তাঁর।'
'নানাভাই ধূনজীর সাথে কখনো দেখা হয়েছে আপনার?'
'ঠাকরে সাহেবের সাথে দু-একবার এখানে এসেছিলেন। বাবার সাথে মন্দিরে দেখা করতেন। লম্বা চুল-দাড়িঅলা খুব মোটা লোক। ধবধবে ফরসা গায়ের রং।'
'আলাপ করে অনেক ভালো লাগল। আশা করি, শীঘ্রি ভালো হয়ে উঠবেন।'
'আমার আর ভালো-মন্দ, বাবা। ভগবানের ডাক আসলে বাঁচি। যে অবস্থায় আছি তা মরারও অধম।'

আমি এগিয়ে গিয়ে বুড়ির একটি হাত ধরলাম। তাকে দুহাজার টাকা দিলাম। বুড়ি জিজ্ঞেস করল,
'টাকা কিসের জন্য, বাবা?'
'আপনার ওই বালা দুটো, যার সাথে এতক্ষণ কথা বললেন, তিনি কিনে নিয়েছেন। আমার বাবার কাছে ওগুলো বন্ধক রেখেছিলেন, মনে আছে? পুরো টাকাটা তো নেননি তখন। এখন কিছু রাখেন।'
বুড়ি খুশি হলো কি না বুঝতে পারলাম না। তবে নাতজামাই যে খুশি হয়েছে, সেটা বোঝা গেল। ফেরার সময় চৌধুরী এবং আমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাল। বলল,
'দরকার হলে আবারও আসবেন। আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম।' বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়!


বুড়ির বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে হেঁটে দুজনে বড় রাস্ত্মায় আসলাম। গুমগুম করে মেঘ ডাকছে। হিলহিলে ঠান্ডা বাতাস। যেকোনো সময় ঝেঁপে বৃষ্টি আসবে। মন্ময় বাবু কোথায় থাকেন জানি না। এখান থেকেই আলাদা হয়ে যাওয়া ভালো। উনি আবারও রিকশা করে বাসায় পৌঁছে দেবেন, ভাবাই অন্যায়। বললাম,
'বাবু, আমাকে একটু নিউ মার্কেটের দিকে যেতে হবে। তবে আর একবার আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আপনার সময় হবে তো?'
'সময় করে একদিন আসেন। এ হপ্তা ব্যস্ত আছি। আগামী শনিবার আসতে পারেন। ফোন করে আসলে ভালো হয়। দোকানের ফোন নম্বর আছে না আপনার কাছে?'
'আজ্ঞে আছে। দোকান থেকে যে রশিদ দিয়েছিলেন, তার ওপর লেখা আছে।'
'গুড। দেখা হবে, কেমন?'
অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন মন্ময়। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তে লাগল। ছোট একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকে চা, কচুড়ির অর্ডার দিলাম। রেস্টুরেন্টের নাম ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার। ঢুকতেই বাঁ হাতে ভাঁটের আগুনে বাবলার খড়ি পুড়ছে। গাঁট পোড়ার পটপট শব্দ পেলাম। এক ইঞ্চি পুরু স্টিলের প্রকাণ্ড তাওয়ায় মোগলায় পরটা, নরমাল পরটা, কিমা পুরি ভাজা হচ্ছে। পাশে কেরোসিনের পাম্প কুকারে কড়াইয়ের ডোবা তেলে কচুড়ি, শিঙাড়া, ডালপুরি, রেগুলার পুরি ফুটছে। এগুলোর সাথে ফ্রি আমড়া, জলপাইয়ের চাটনি। ঘন দুধের ধোঁয়া ওঠা চা। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। রেস্টুরেন্টের টিনের চালে ঝমঝমাঝম। চমৎকার পরিবেশ। মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। বৃষ্টি ধরে এল দুঘণ্টা পর। এর মধ্যে কচুড়ি, শিঙাড়া, পুরি, দুই খুরি চাটনি, তিন কাপ চা, তিনটা ৫৫৫ সিগারেট শেষ করেছি। বাসায় ফিরতে হবে। মা দুশ্চিন্তা করবে। শেখ মুজিব হত্যার পর হিন্দুরা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে। আসল অবস্থা সেরকম না মোটেও। বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘই খাচ্ছে বেশি। মাইনরিটি সারা জীবনই নিজেদের অনিরাপদ ভাবে।


ছ'দিন বাদে ফোন করলাম মন্ময় চৌধুরীকে। পরদিন শনিবার। বিকেলের দিকে দোকানে যেতে বললেন। দোকানে গিয়ে দেখি কাউন্টারে বুড়ো ম্যানেজার বসে আছে আমাকে সাহেবের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। পুরো দোকান খালি। শনিবার আধবেলা, রবিবার পুরো দিন ছুটি। অফিসে বসে আছেন মন্ময়। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছেন বালা দুটোর দিকে। আমাকে ইশারায় বসতে বললেন। ম্যানেজারকে বললেন চলে যেতে। শুরু করলেন মন্ময় বাবু :
'সঞ্জয় বাবু, কোনো প্রশ্ন করবেন না। শুধু শুনে যান। আশা করি আপনার সব কৌতূহল মিটে যাবে। এই বালা দুটো অনেক দিন আগেকার। লক্ষণ সেনের আমলের। সেনেরা দক্ষিণ ভারতের লোক, জানেন তো? এঁরা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। সেনেরা বাংলাদেশে আসার আগে এই দেশ শাসন করত পালরা। তখন এখানকার বেশির ভাগ লোকই ছিল বৌদ্ধ। হিন্দুদের ভেতরও জাতপাত তেমন ছিল না বললেই চলে। থাকলেও তেমনভাবে কেউ মানত না। সেনেরা এসে সবকিছু পাল্টে দিল। বিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হলো বৌদ্ধ নিপীড়ন। পরে বখতিয়ার খলজির আমলে এই বৌদ্ধরাই দলে দলে মুসলমান হয়। এই জন্যই হিন্দুরা বাঙালি মুসলমানদের বলে নেড়ের জাত। বৌদ্ধরা মাথাটাতা কামিয়ে ন্যাড়া হয়ে থাকত বলেই এই বিশেষণ। সেনেরা বাঙালিদের বিদেশে যাওয়াও বন্ধ করে দেয়। ব্রাহ্মণরা ঘোষণা করে, কোনো বাঙালি বিদেশে গেলে জাতিচ্যুত হবে। বাঙালি জাতি কুয়োর ব্যাঙ হয়ে ঘরে বসে থাকল। দিন-দুনিয়ার খবর আর রইল না কিছু তার কাছে।

'লক্ষ্ণণ সেনের ঝোঁক ছিল তান্ত্রিকতার দিকে। লক্ষ্ণী নারায়ণ নামের এক কাপালিক ছিল তার গুরু। এই বালা দুটোর মুখগুলো দেখেন। দুটো ছাগির মুখ। অথচ সাধারণ বালাতে ব্যবহার হয় হাতি অথবা মাছের মুখ। মুখগুলোতে প্যাঁচ লাগানো। দু'আঙুলে ধরে ঘোরালেই খোলে। আমি খুলেছি ওগুলো। ভেতরে সাদা সিল্কের ওপর ব্রাহ্মী লিপিতে হাকিনী বশীকরণ মন্ত্র লেখা। তন্ত্রসাধনায় বসলে সাধকের আসনের চারপাশে সে নকশা আঁকতে হবে, সেটাও দেওয়া আছে এখানে। এগুলোকে ইংরেজিতে বলে অ্যামুলেট। নকশার ভেতরের ঘরগুলোর একটাতে লেখা 'নাদেস সুরাদেস ম্যানিনার'। প্রাচীন ব্যাবলনীয় ভাষা। এ মন্ত্র ভারতীয় নয়। এটা ব্যাবলনীয়। প্রথম খিষ্টধর্ম, এরপর ইসলামের যখন প্রসার হলো, সেই সময় অনেক প্রেতসাধক ইরাক এবং সিরিয়া থেকে ভারতে চলে আসে। তন্ত্রমন্ত্র এখানে সারা জীবনই আছে। নরবলি, শবসাধনা এসব কাজে কোনো বাধানিষেধ নেই। লাকুম দ্বীনুকুম। যার যার ধর্ম তার তার কাছে। ব্যাবিলনে তান্ত্রিকেরা বেড়ে উঠেছিল রাজানুকূল্য পেয়ে। ভারতেও সেটা পেতে তাদের খুব বেশি অসুবিধা হয়নি।

'বখতিয়ার খলজি বাংলা দখল করে নিলে লক্ষ্ণণ সেন পালিয়ে গেল পূর্ব বাংলার রাজধানী বিক্রমপুরে। সাথে লক্ষ্ণী নারায়ণ। মনে প্রতিহিংসার আগুন। হারানো রাজ্য কীভাবে ফিরে পাবে রাত-দিন সেই ভাবনা। দৌর্দণ্ডপ্রতাপ বখতিয়ার আর তার মুসলমান সৈন্যরা এক মূর্তিমান বিভীষিকা। চিন্তা বাড়ে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে হতাশা। বাঙালি সেনদের দুঃশাসনে নিষ্পেষিত। গণ সমর্থন দুরাশা। লোকবল, অর্থবল, মনোবল কোনোটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রান্তিকালে এগিয়ে এল কাপালিক লক্ষ্ণী নারায়ণ। বখতিয়ার বিনাশ হবে হাকিনীর হাতে। জ্বরাসূরের বিকট মূর্তির সামনে জোড়া মোষ বলি হলো। লক্ষ্ণী নারায়ণের ইচ্ছে ছিল কুমারী উৎসর্গ করার। লক্ষ্ণণ রাজি হননি। দেশের অবস্থা ভালো না। কুমারী, অকুমারী, বিবাহিতা সবারই বাবা-মা থাকে। এ নিয়ে ভেজাল হলে বিক্রমপুর ছেড়ে মিয়ানমারে গিয়ে উঠতে হবে। পুবে এখন শুধু ওই রাজ্যই নিরাপদ। বখতিয়ারের এখতিয়ার মগের মুল্লুকে নেই। আয়োজন সম্পন্ন হলো বটে, তবে সমস্যা একটা রয়েই গেল। শবসাধনা করে হাকিনী ডেকে এনে বখতিয়ার বধ করতে হলে বখতিয়ারের কাছাকাছি থাকতে হবে। হাকিনীর কাছে রামও যা, রাবণও তা-ই। সে থাকে চির অন্ধকারের রাজ্যে। বখতিয়ারকে হাকিনী চেনে না। তাকে চিনিয়ে দিতে হবে। লক্ষ্ণণ সেন পালিয়ে আসার সময় বখতিয়ার ছিল নদিয়ায়। এখন কোথায় আছে কে জানে? মুসলমান যোদ্ধারা নাকি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামেই না। খাওয়া, ঘুম, নামাজ, যা-কিছু সব ওখানেই। বখতিয়ার ঘোড়ার পিঠেই থাকে দিনের অর্ধেক সময়। ভেবেচিন্তে এক বুদ্ধি বের করল লক্ষ্ণী নারায়ণ। তার দুজন সাগরেদকে পাঠাল এই কাজে। শুরু হলো 'মিশন বখতিয়ার'।

'বাসমতি চাল পুড়িয়ে বানানো কয়লার সাথে ঘোড়ার রক্ত আর গর্ভবতী নারীর প্রস্রাব মিশিয়ে তৈরি কালিতে সাদা সিল্কের ওপর হাকিনী জাগানো মন্ত্র লিখে কাপড়টা দুটুকরো করে লক্ষ্ণী। এই দুটো বালার ভেতর টুকরো দুটো ভরে সাগরেদ দুজনের হাতে একটা করে পরিয়ে দেয়। দুই সাগরেদ শুম্ভ ও নিশুম্ভ নদিয়ায় এসে জানতে পারে বখতিয়ার রংপুর অভিযানে। ওখান থেকে পায়ে হেঁটে রংপুর রওনা হলো তারা। দুদিন পর পদ্মা পার হয়ে বরেন্দ্র বা রাজশাহী পৌঁছাল। তখন চৈত্র মাস। রাজশাহীতে কলেরা-বসন্তে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হচ্ছে। কলেরার মহামারি চলছে, এমন এক গ্রামে সন্ধের মুখোমুখি ঢুকল দুজনে। দেখতে পেল তিন রাস্তার মাথায় ফাঁকা উঁচু ঢিবির মতো হাট বসার জায়গা। এর পাশেই প্রকাণ্ড বটগাছতলায় ধূপধুনো জ্বালিয়ে ওলাওঠা দেবীর পুজো হচ্ছে। রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ পরপরই কাঁচা বাঁশের খাটিয়ায় বলহরি হরিবল করতে করতে শশ্মানে যাচ্ছে লাশ। শুম্ভ ও নিশুম্ভ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। মহামারি লেগেছে এমন গ্রামে জল পর্যন্ত খাওয়া নিষেধ। অথচ সাগরেদদের অবস্থা এত খারাপ যে কিছু না খেলে কলেরা-বসন্তে না-ও যদি মরে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অবশ্যই মারা যাবে। হাটের কাছে এক ময়রার দোকান দেখতে পায় তারা। সেখানে দই, চিড়ে, খাগড়াই খেয়ে প্রাণ বাঁচাল। শুয়ে পড়ল বটতলায়। শেষরাতে নিশুম্ভের পেট নেমে গেল। এশিয়াটিক কলেরা বড় মারাত্মক ছিল। কাউকে ধরলে চব্বিশ ঘণ্টার ভেতরে যমালয়ে পাঠিয়ে দিত। পরদিন বিকেলে নিশুম্ভ ওলাওঠা দেবীর পায়ের কাছে মরে পড়ে থাকল।

'বালাটা আস্তে করে তার হাত থেকে খুলে নিয়ে বিদেয় হলো শুম্ভ। রংপুরের রাস্তা ধরল। অন্তত তার কাছে তাই-ই মনে হলো। অন্ধকারে সারা রাত হেঁটে সকালে যেখানে পৌঁছাল, সে জায়গার চেয়ে কলেরা গ্রাম অনেক ভালো ছিল। ছোট এ গ্রামটির প্রায় সবাই ফাঁসুড়ে ডাকাত। বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। দারা-পরিবার নিয়ে দিব্যি ঘর-সংসার করছে সবাই। সম্পন্ন গৃহস্থ। কিন্তু ভেতরে ভিন্ন চিত্র। নিরীহ, শ্রান্ত পথিকদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাড়িতে এনে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাদেরকে মেরে ফেলাই এদের কাজ। এমনই এক ডাকাত ফ্যামিলির পাল্লায় পড়ে সে। দুদিন পর ডাকাতদের হাতে প্রাণ হারাল শুম্ভ। তবে মারা যাওয়ার আগে সব ঘটনা লিখে রেখে যায় সে। এ কাজে মন্ত্র লেখা সিল্কের কাগজটিই ব্যবহার করে। আমি ধারণা করছি, বালা দুটো ডাকাত তার স্ত্রী অথবা মেয়েকে দিয়েছিল। বাঙালি মায়েরা তাদের গয়না দিয়ে যান মেয়েকে বা ছেলের বৌকে। বংশপরম্পরায় একই গয়না হাতবদল হয়। পুরোনো গয়না ভেঙে নতুন গয়না বানানোর চল এখন যেমন আছে আগে তেমন ছিল না। ওতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি পড়ত।

'সুলতানী আমলে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলে আট রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প হয়েছিল। ব্যাপক ভূমিধসে তলিয়ে যায় অসংখ্য গ্রাম, গঞ্জ, নগরী। গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ লোক। এদের অনেকেই তখন দক্ষিণাঞ্চলে মাইগ্রেট করে। সম্ভবত সেই সময়ই এগুলোর তৎকালীন মালিক এই এলাকায় চলে আসে। পরে এখানে বর্গিদের উৎপাত শুরু হলে বালাগুলো খুল্লনা দেবীর মন্দিরে রেখে দেয় সে বা তার উত্তর পুরু ষ। পরে আর ফিরিয়ে নিতে পারেনি।

'ব্রিটিশ আমলে খুলনায় ম্যাকপিস থ্যাকারে নামের এক ইংরেজ সাহেবের দোকান ছিল। স্যাবর অ্যান্ড ড্র্যাগুন নামের এই দোকানটির ব্রাঞ্চ ছিল কলকাতাতেও। মূল দোকান লন্ডনে। এই দোকানে ভালো ভালো সব অ্যান্টিক বিক্রি হতো। এই থ্যাকারে সাহেবকেই লোকেরা ডাকত ঠাকরে সাহেব বলে। থ্যাকারে জানতে পারে, খুল্লনা দেবীর মন্দির অনেক পুরোনো। প্রচুর অ্যান্টিক লুকানো আছে ওখানে। বুড়ির বাবার সাথে খাতির জমিয়ে অনেক জিনিস হাতিয়ে নেয় সে। অ্যান্টিক কেনার মতো লোক খুলনায় কেউই ছিল না। থ্যাকারের দোকানটি ছিল আসলে অ্যান্টিক কালেকশনের একটি আউটপোস্ট মাত্র। দালালেরা সরাসরি দোকানে গিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে কালেক্ট করা আর্টিফ্যাক্ট সাহেবের কাছে বিক্রি করত। যাহোক, বালাগুলো সাহেবের হাতে পড়লে সে বুঝে ফেলে, ওগুলোর মুখ খোলা যায়। মুখ খুলে একটি বালার ভেতর পায় মন্ত্রতন্ত্র লেখা সিল্ক, অন্যটিতে শুম্ভের লেখা কাহিনি। ধারণা করছি, কাদম্বিনী দেবীর বাবাকে ওগুলো দেখায় সে। জানতে চায়, কী লেখা আছে?

'নানাভাই ধূনজীর ছিল ফিটন গাড়ি, পালকি, তাঞ্জাম এসব তৈরির কারখানা। কোম্পানি আমল থেকেই লাট সাহেবেরা পালকির ভক্ত হয়ে পড়ে। এত বেশি ভক্ত হয় যে অর্ডিন্যান্স জারি করে আমলারা ছাড়া ওগুলোতে কেউ চড়তে পারবে না। তবে ওই আইন কেউ মানেনি। আমলা-কামলা যে যেমন পারে, দেদারসে পালকি ব্যবহার করত। এখন যেমন ট্যাঙ্ িকোম্পানি আছে কলকাতায়, তেমন পালকি কোম্পানি ছিল। অসংখ্য বেহারা বেতন দিয়ে পুষত তারা। সবচেয়ে বড় পালকি কোম্পানির মালিকও ছিল আবার ধূনজীই। পাকা রাস্ত্মাঘাট তৈরি হওয়ার পর ল্যান্ডো এবং ফিটন গাড়ির চাহিদা হয় ব্যাপক। ইংরেজ সাহেব, উঠতি জমিদার, স্থানীয় মহারাজারা ছিল ওগুলোর খদ্দের। থ্যাকারে ছিল নানাভাই ধূনজীর কমিশন এজেন্ট। ধূনজীর সাহায্যে অনেক অ্যান্টিকও কালেক্ট করত সে। দুজনে হয়ে ওঠে মানিকজোড়।

'অ্যান্টিক ডিলার হওয়ায় রহস্যময় সব ব্যাপারে থ্যাকারের আগ্রহ ছিল অসীম। সিল্কের টুকরো দুটো পাওয়ার পর তন্ত্রমন্ত্রে আগ্রহী হয়ে ওঠে থ্যাকারে। কান টানলে মাথা আসে। ধূনজীও যোগ দিল এসে। ওদিকে মন্দির থেকে বহু জিনিস লোপাট করায় কাদম্বিনী দেবীর বাবার ওপর প্রধান সেবায়েতের সন্দেহ হয়। ওখান থেকে সরে পড়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে সে। ধূনজী নবাবি আমলের বড় একটি বাড়ি খুলনায় আগেই কিনেছিল। এ অঞ্চলে ভালো কাঠ সস্তা ছিল। তার কলকাতার কারখানার কাঁচামাল এই বাড়ি থেকে নদীপথে চালান হতো। ধূনজীকে বলে বাড়িটা কাদম্বিনী দেবীর বাবাকে পাইয়ে দেয় থ্যাকারে। উদ্দেশ্য, তাকে কাছাকাছি রাখা। আমার ধারণা, হাকিনী বশীকরণ ছাড়াও আর যেসব তন্ত্র বা পিশাচ-সাধনা আছে সেগুলোও তারা করেছে। টাকা আর ক্ষমতা লাভই ছিল তাদের সাধনার মূল লক্ষ্য।'
অনেকক্ষণ কথা বলে থামলেন মন্ময়।

'কাদম্বিনী দেবীর কাছে এত দিন ওগুলো ছিল, অথচ একদিনও উনি খুলে দেখলেন না? আপনিই বা বুঝলেন কী করে যে ওগুলো খোলা যায়?' জিজ্ঞেস করলাম আমি।
'বিখ্যাত স্বর্ণকারের নিখুঁত কাজ। আগে থেকে জানা না থাকলে বোঝার উপায় নেই। এ পর্যন্ত কলকাতা থেকে গয়নার যত ক্যাটালগ বেরিয়েছে, তার সবই আছে আমার কালেকশনে। মজার ব্যাপার কী জানেন, এর ভেতরে থ্যাকারে সাহেবের নিজের ছাপানো একটা ক্যাটালগও আছে। হাতে পাওয়ার পর ক্যাটালগ বের করে মিলিয়ে দেখেছি ছবির সাথে আসল বালা দুটো। সব আইটেমের বিস্তারিত বিবরণ আছে বইটিতে। ইতিহাস, শৈলী, মূল্য, প্রাপ্তিস্থান এইসব আর কি। ওগুলো যে সেন আমলের ডিজাইন, সেটা থ্যাকারের বর্ণনা থেকেই পাওয়া। তবে এর পেছনের যে কাহিনি সেটা এর ভেতরের চিরকুট থেকে জেনেছি। বাকিটা নিজের হাইপোথেসিস। তবে সে সময়ের লেখা খুলনা গেজেটিয়ার এবং খুলনা মিউনিসিপ্যালিটির ফাইলপত্র ঘেঁটেও অনেক তথ্য পেয়েছি।'

আমার মনে হলো, মন্ময় চৌধুরী সবটুকু আমাকে এখনো বলেননি। জিজ্ঞেস করলাম,
'আপনার আগ্রহ কী শুধু ওগুলোর ইতিহাস জানার ব্যাপারেই সীমিত?'
মন্ময় চৌধুরী আমার দিকে ঘুমঘুম চোখ তুলে তাকালেন। বললেন,
'না, হাকিনীর ব্যাপারটি আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত হলো, হাকিনী জাগানোর যে সাধনা সেটার বৈশিষ্ট্য। এই হাকিনীরা খুব নীচু স্তরের পিশাচ। এদের বুদ্ধিবৃত্তি পশুশ্রেণীর। তবে ক্ষমতা প্রচণ্ড। এদেরকে ডেথ অ্যাঞ্জেল বলতে পারেন। ডেকে এনে যার মৃত্যু চান, তাকে চিনিয়ে দেবেন। সেটারও প্রক্রিয়া আছে। তবে সমস্যা হলো, এরা প্রাণ না নিয়ে ফিরবে না। যার জন্য ডাকা, তাকে মারতে না পারলে যে ডেকেছে, তাকেই মেরে ফেলবে। হাকিনী জাগাতে হলে অশুচি যজ্ঞ করতে হয়। এই অশুচি যজ্ঞ হলো মৃতা কোনো যুবতীর সাথে যৌন সঙ্গম। যাকে পশ্চিমারা বলে নেক্রোফিলিয়া। নেক্রোফিলিয়া বহু প্রাচীন প্রথা। বার্মা এবং দক্ষিণ ভারতে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। ছিল পুরাকালে মিসরে ও ব্যাবিলনে। বার্মা এবং দক্ষিণ ভারতে কোনো অবিবাহিত তরু ণী মারা গেলে একজন পুরু ষকে সেই শবের সাথে বিয়ে দেওয়া হতো। পুরু ষটি তখন স্বামী হিসেবে যুবতীর লাশের সাথে সঙ্গম করত। মিসর মমির কারিগরদের ভেতর এই নেশা ছিল প্রবল। এ জন্য যুবতী মেয়েদের লাশ তাদের বাবা বা স্বামীরা দু-তিন দিন বাইরে ফেলে রেখে পচিয়ে এনে তারপর মমির কারিগরদের হাতে তুলে দিত। ইউরোপেও নেক্রোফিলিয়ার চর্চা ছিল। এ নিয়ে বহু গল্প-কাহিনি প্রচলিত আছে।'
'আপনি এত কিছু জানলেন কীভাবে? দেখতেই পাচ্ছি, এর পেছনে সময়, শ্রম দুটোই ব্যয় করেছেন প্রচুর। কিন্তু এত সব করে লাভ কী?'
'এই এক নেশা রে, ভাই। আমার এক কাকা ছিলেন তান্ত্রিক। ছেলেবেলায় তার পিছে পিছে ঘুরতাম। রাজ্যের যত অদ্ভুত জিনিসপত্রে কাকার ঘর ভর্তি ছিল। আমার যখন দশ বছর বয়স, তখন তিনি বিহারে যান। সেখানে এক দুর্গম এলাকায় মস্ত গুণীনের খোঁজ পান তিনি। এরপর নিজেই নিখোঁজ হন। আমার বয়স বাড়তে লাগল, সেই সাথে পৌনঃপুনিকভাবে বাড়তে লাগল নেশাও। সোনার কারবার আমাদের তিন পুরু ষের। প্রচুর বিষয়-সম্পদ। ব্যবসা চলছে কঠিন এক সিস্টেমের ভেতরে। কিছু না দেখলেও ওটা ঠিকই চলবে। আমি সময় কাটাই ভারতের উপজাতীয় গোত্রগুলোর উপাস্য দেবদেবী, তন্ত্রমন্ত্র বিষয়ে পড়াশুনো করে। প্রকৃত তান্ত্রিক আজকাল খুঁজে পাওয়া কঠিন। ঠিকমতো উপচার সাজিয়ে নৈবেদ্য দিলে এগুলো আসলেই কাজ করে কি না জানা যেত।'
'আপনার তো এ ব্যাপারে প্রচুর পড়াশোনা। এইসব মাম্বোজাম্বো আসলেই বিশ্বাস করেন?'
'দেখেন থিওরি এক জিনিস, প্র্যাকটিকাল আর এক। সব নিয়ম মেনে ট্রাই করলেই কেবল এর প্রায়োগিক ব্যাপারটি জানা যাবে।'
'হাকিনী জাগানো মন্ত্র, প্রক্রিয়া সব তো হাতের কাছেই আছে। এই বিষয়টি দিয়েই সেই পরীক্ষা হতে পারে।'
'সঞ্জয় বাবু, হাকিনী এক সর্বনাশা জিনিস। যদি সত্যিই তাকে জাগানো যায়, তাহলে সে তো প্রাণ না নিয়ে ফিরবে না। এ হচ্ছে আগে গেলে বাঘে খায়, পিছে গেলে খায় হায়েনা। পিশাচ সাধনা আর ঝুঁকি হলো পি'জ অ্যান্ড ক্যারট। হাকিনী সাধনায় যেসব উপচার লাগে তা জোগাড় করা যাবে। তিথি-নক্ষত্র দেখে যজ্ঞের কাল নির্ণয় করাও কঠিন না। কঠিন হলো শব সাধনার জন্য যুবতী নারীর টাটকা লাশ জোগাড় করা। তারচেয়ে কঠিন ওই লাশের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া। ব্যাপারটি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি আমি। বের করার চেষ্টা করেছি এর বিকল্প। শয়তান হলো চূড়ান্ত অপবিত্র সত্তা। জুডিও-ক্রিশ্চান-ইসলা­মিক ট্রেডিশনে বলা হয়েছে, আজাজিল আদম হাওয়ার পতন ঘটিয়েছিল তাদের যৌনতাকে পুঁজি করে। ইহুদি-খ্রিষ্টান দু'ধর্মেই যৌনমিলন একটি অপবিত্র বিষয়। ক্যাথলিক পাদ্রিদের জন্য এই কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধর্মগুলোতে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ যৌনমিলন দেহ ও মনকে পুরোপুরি কলুষিত করে। একটা উদাহরণ দেই। ইসলাম বলে, হজরত ইব্রাহিম তিনটি প্রধান একশ্বরবাদী ধর্মেরই আদি পিতা। ব্যাবিলনের বাদশা নমরু দ তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল। বিশাল আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে তাঁকে তুলে তার ভেতর ফেলতে গেল নমরু দের লোকেরা। দেখা গেল, পয়গম্বর এত ভারী যে তাঁকে মাটি থেকে তোলাই সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাপার কী জানার জন্য নমরু দ তার পুরোহিত-গণকদের ডেকে পাঠাল। এরা যা বলল, তা এই রকম। খোদার ফেরেশতারা ইব্রাহিমকে ধরে আছে। একশো হাতি লাগিয়ে টানলেও তাঁকে মাটি থেকে ওঠানো যাবে না। উপায় কী? ফেরেশতাদের তাড়াতে হবে। গণকেরা নমরু দকে বুদ্ধি দিল জায়গাটিকে অপবিত্র করার। নমরু দ তখন উপস্থিত জনতাকে প্রকাশ্যে অবাধ যৌনমিলনের নির্দেশ দিল। ঘটনাস্থল অপবিত্র হলো। পালাল ফেরেশতার দল। ইব্রাহিমকে নিক্ষেপ করা হলো আগুনে। যেসব মেয়েরা ওই কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, তারা নমরু দের কাছে পুরস্কার দাবি করে। সঙ্গমবাজ রতিক্লান্ত রমণীদের সহজে চেনার জন্য তাদের কপালে টিপ দেওয়া হয়। এ জন্য মুসলমান মেয়েদের কপালে টিপ দেওয়ার ব্যাপারে কিছুটা নিষেধাজ্ঞা আজও আছে।'
'মন্ময় বাবু, আপনার পরিকল্পনাটা আসলে কী?'
'বলছি রে ভাই, একটু ধের্য ধরেন। মন্ত্র-তন্ত্র, পিশাচ সাধনা-এসব বিষয়ে সঠিক সূত্র খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। শব সাধনার কথাই ধরি। প্রায় সব বর্ণনায় আছে, ডোম চাঁড়ালের কুমারী মেয়ে যার অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে, সেই রকম একটি উলঙ্গ লাশের ওপর অমাবস্যার রাতে বসে সাধনা করতে হবে। লাশের বয়স তিন দিনের বেশি হওয়া চলবে না। ভেবে দেখেন, ডোম-চাঁড়ালের মেয়েদের প্রায় সবারই বিয়ে হয় যখন তারা কিশোরী। তার ওপর তাকে মরতে হবে অপঘাতে। সবচেয়ে কঠিন শর্ত হলো, এই মৃত্যুটাও হতে হবে অমাবস্যা রাতের কাছাকাছি সময়ে। সাত দিন আগে-পিছেও যদি হয় তাহলেও সমস্যা। লাশে পচন ধরবে। ফরমালিন, বরফ, হিমঘর-এইসব সামগ্রী কাপালিক, তান্ত্রিকদের কল্পনাতেও ছিল না। তবে এ ক্ষেত্রে আমার বিশ্বাস, ঠিকমতো সবকিছু করলে ফল ফলবে। এটা প্রামাণ্য দলিল। অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারছি। তবে প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। হাকিনী ডেকে এনে তাকে দিয়ে করবটা কী? আমি অজাতশত্রু। তবে আপনার কথা আলাদা। মোটা মোসলেমের ওপর আপনি যদি প্রতিশোধ নিতে চান তাহলে . . . ।'
'লাশের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিকল্পটির কথা কিন্তু এখনো বলেননি।'
'বলেছি। আপনি খেয়াল করেননি। আমাদের হয় কোনো জায়গা অশুচি করতে হবে, অথবা এমন জায়গা খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে শুচি বলে কিছু নেই। অশুচি অনেকভাবেই হতে পারে। তবে এরমধ্যে যৌন ব্যাপার মুখ্য হতে হবে।'
“পতিতালয় ছাড়া এমন জায়গা আর কোথায় পাওয়া যাবে?”
"ধারণা সঠিক। তবে আশপাশের এলাকায় করা যাবে না। লোকে চিনে ফেলবে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মার চরে নতুন পাড়া হয়েছে। জমজমাট ব্যবসা। পাড়ার মাঝখানে একটা কামরা ভাড়া নেওয়া যেতে পারে। সাধনার সব উপচার এখান থেকে রেডি করে নিয়ে গেলে এক রাতেই কাজ সারা সম্ভব। হাকিনী সাধনায় নক্ষত্র-তিথি কোনো বিষয়ই নয়। পূর্ণিমা ছাড়া যেকোনো রাতেই হতে পারে। তবে আষাঢ় মাসের দিকে হলে উত্তম। আপনি ভেবে দেখেন, সাধনায় বসতে চান কি না। খরচপত্র, ব্যবস্থা সব আমার দায়িত্ব।'
'মোটা মোসলেমকে চিনিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটি কীভাবে হবে?'
'ওর একটা ফুল-সাইজ ছবি আমাকে এনে দেন। তারপর কী করতে হবে, বলে দেব।'


মোটা মোসলেমের ছবি জোগাড় হলো সহজেই। সাপ্তাহিক রূপসা সংবাদ-এর রিপোর্টার কমল কান্তি পাড়ার লোক। আমরা তাকে ডাকি ককা'দা বলে। ছবি তার বাসাতেই এক ফাইলে ছিল। এলাকারই এক ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণী সভা। মোটা মোসলেম প্রধান অতিথি। বিজয়ীর হাতে কাপ তুলে দিচ্ছে। মুখে দেঁতো হাসি। বললাম, দুদিনের ভেতর ছবি ফেরত দেব।
'ছবি নিয়ে কী করবে?' জিজ্ঞেস করল ককা।
উত্তর আগেই রেডি করে রেখেছিলাম। বললাম,
'দৌলতপুরে নন্দঘোষ মার্ডার কেসের কথা তো জানেন। বছর খানেক আগের ঘটনা। ভরদুপুরে মোকামে বসা অবস্থায় খুন হয় নন্দঘোষ। খুনিদের সাথে মোটা মোসলেম ছিল। নন্দঘোষের কর্মচারীদের ছবিটা দেখাতে চাই আমি। যদি আইডেন্টিফাই করতে পারে? বাবার উকিলই এ পরামর্শ দিয়েছে।'
'চিনতে পারলেও মোসলেমের বিরু দ্ধে আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষী দেবে বলে মনে হয় না। শোনো সঞ্জয়, আমি কিন্তু এসবের ভেতরে নেই। তোমাকে ছবি দিয়েছি, এটাও কাউকে বলতে পারবে না। ক্রাইম রিপোর্ট আমি করি। পত্রিকার কাটতি বাড়ে। সম্পাদক পছন্দ করেন। তবে ওগুলো 'রিকশাঅলা কর্তৃক মেথরানী ধর্ষিত' টাইপের হয়। বড় বড় চাঁইদের ঘাঁটাতে জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টাররাই সাহস পায় না! ককা কিছু লিখতে গেলে ফান্দে পড়িয়া বকা কান্দেরে অবস্থা হবে।'

ছবি মন্ময় চৌধুরীর হাতে পৌঁছে দিলাম। বললেন, দুদিন পর বিকেল তিনটের দিকে তার দোকানে যাওয়ার জন্য। আরও জানালেন, বাসায় যেন বলে আসি ফিরতে একদিন দেরি হবে।

১০
পরদিন ইনস্যুলিন কিনে জেলে বাবার সাথে দেখা করতে গেলাম। তার ডায়বেটিস আছে। রেগুলার ইনস্যুলিন নেন। বাবার ইনস্যুলিন শেষ। সকাল ন'টায় দরখাস্ত জমা দিয়ে জেলগেটে বাসে আছি। চারদিকে পানের পিক, চুনের দাগ, কলার খোসা, বিড়ির মাথা, প্রস্রাবের ঝাঁঝালো গন্ধ। সাব ইন্সপেক্টরকে এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট, একশো টাকা দিয়েছি। দালাল নিয়েছে বিশ। বড় সাহেব এখনো আসেননি। অপেক্ষা করছি তো করছিই। এগারোটার দিকে তিনটা মোটরসাইকেলে পাঁচজন রাজনৈতিক কর্মী সঙ্গে নিয়ে মোটা মোসলেম এসে হাজির। সাব ইন্সপেক্টর উঠে দাঁড়িয়ে গেল। বিষয় কী? তার দুজন 'ছেলে' জেলহাজতে আছে। আজকেই বেইল হবে। অথচ তাদের জেল পুলিশ কোর্টে চালান করেনি। সাব ইন্সপেক্টর বলল,
'বড় ভাই, কোনো চিন্তা করবেন না। দুজন কনস্টেবল দিয়ে এখনই রিকশা করে পাঠিয়ে দিচ্ছি। বসেন, চা খান। আমি কাগজপত্র রেডি করি। চালানে জেলার সাহেবের সই লাগবে। উনি এখনো অফিসে আসেন নাই। সেটা কোনো ব্যাপার না। সেপাইয়ের হাতে দিয়ে কাগজ পাঠাচ্ছি। সই নিয়ে আসবে। বাসা কাছেই, বেশিক্ষণ লাগবে না। এই হামিদ, ভাইয়ের জন্য ডবল পাতি চা আন। দুধ-চিনি বেশি। সাথে হুগলী বেকারির কেক।'
আমাকে দালাল বলল,
'ভাই, কালকে আসেন। আজ দেরি হবে। ওপর থেকে চাপ আছে। সাহেব ব্যস্ত।'
রাগে আমার গা কাঁপতে লাগল।

১১
পরদিন জেলে যেতে পারলাম না। মন্ময় চৌধুরীর সাথে দেখা করার কথা, গেলাম সেখানে। আমাকে বসতে বলে ড্রয়ার খুলে বেল কাঠে তৈরি ফুট খানেক লম্বা একটা মূর্তি বের করলেন বাবু। তার কারিগর বানিয়েছে। হাতে নিয়ে দেখলাম ভেতরটা ফাঁপা। কিছুক্ষণ পর জিপে করে রওনা হলাম আমরা।
'আরও আগে বের হলে ভালো হতো না?' গাড়ি ছাড়ার পর বললাম আমি।
'না, হতো না। দিনের বেলা ওখানে যেতে চাই না আমি। সন্ধ্যা আটটা নাগাদ পৌঁছাব আমরা।'

ড্রাইভারকে গোয়ালন্দ বাজারে গাড়ি পার্ক করতে বললেন মন্ময়। পাশেই বড় বড় গোডাউন। চিটে গুড়ের মিষ্টি গন্ধে আকাশ-বাতাস সয়লাব। মালপত্র সমেত দুজন দুটো রিকশায় উঠলাম। দৌলতদিয়ার নিষিদ্ধ পল্লি এখান থেকে চার মাইল দূরে। মাঝবয়সী রিকশাঅলা জিজ্ঞেস করল,
'স্যার, আপনারা কোন জাগাত যাবেন?'
'দৌলতদিয়া,' বললাম আমি।
'দৌলতদিয়ার কুথায়? ফেরিঘাট, না মাগিপাড়া?'
'পাড়ায় চলো।'
'কুড়ি ট্যাকা ভাড়া দিবেন।'
'কুড়ি টাকাই পাবে, চলো।'

হেরিং বোন্ড রাস্তা। ঝাঁকুনি প্রচণ্ড। রিকশার সিট ছোট। সামনের দিকে ঢালু। বসে থাকা দায়। একবার হুড ধরতে হচ্ছে, আরেকবার রিকশাঅলার সিট। চারদিক ফাঁকা। হু হু ঠান্ডা বাতাস। গুমগুম করে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি শুরু হলে ভিজে ন্যাতা হতে হবে। চর এলাকা, একটা গাছ পর্যন্ত কোথাও নেই। শুধু কাশবন। হঠাৎ পুরো ব্যাপারটিকেই মনে হলো এক অবাস্তব অলীক কল্পনা। আবার এ-ও মনে হলো, আমি এসব কেন করছি? শুধুই প্রতিশোধ, নাকি অদম্য কৌতূহল?

ঘণ্টা খানেক পর ভিজে-পুড়ে যেখানে এসে পৌঁছালাম, সে এক অন্য জগৎ। এখানে কারেন্ট নেই। দোকানে দোকানে হ্যাজাক বাতি। ঘরে ঘরে হারিকেন। অগুনতি ছোট-বড় ঘর, গলি-ঘুপচি। দোকানপাট, ঘরবাড়ি, বাঁশ চাটাই, টিন দিয়ে বানানো। দেদার বিক্রি হচ্ছে পান, সিগারেট, ফুল, বাংলা মদ। কালো কুচকুচে ইয়াবড় কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, ডালপুরি। ছোট মাইকে গান বাজছে: নিশীথে যাইয়ো ফুলবনে ও ভোমরা। অনেকগুলো ঘরে শুধু একদিকেই চাটাইয়ের বেড়া। মাটির উঁচু মেঝেতে বাঁশের মাচা। সেজেগুঁজে খোলামেলা শাড়ি, সালওয়ার কামিজ পরে বসে আছে সুবর্ণ কঙ্কন পরা স্বাস্থ্যবতী রমণীরা। খিলখিল হাসি। মাঝেমাঝে গানের কলি। আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন। তবে একটি জিনিস ভালো এদের। উগ্র সাজগোঁজ, ঝ্যালঝেলে মেকাপের বালাই নেই।

বুড়ো এক লোক আমাদের ঘর দেখিয়ে দিল। সরু দরজা, দুদিকে দুটো কাঠের জানালা, মাটির মেঝে। ঘর পুরো খালি। মন্ময় চৌধুরী পাকা লোক। আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। মন্ময় বুড়োকে দুশো টাকা দিয়ে কী যেন বললেন। কিছুক্ষণ পর লোকটা আমাদের মিশকালো দুটো মোরগ আর একটি কেরোসিনের স্টোভ দিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করে হুড়কো লাগিয়ে দিলেন বাবু। ব্যাগ খুলে টুকিটাকি অনেক জিনিস বের করলেন। টকটকে লাল সিঁদুর দিয়ে উল্টো করে বড় একটা ত্রিভুজ আঁকলেন মেঝেতে। ওটার ওপর সোজা আরেকটি ত্রিভুজ। দেখতে হলো ছয় কোনা তারা। তারাটাকে ঘিরে দিলেন আতপ চালের গুঁড়োয় আঁকা প্রকাণ্ড একটি বৃত্ত দিয়ে। ত্রিভুজের ভেতর ছয়টি কোণে সাপের কাটা লেজ, পেঁচার নখ, বাদুড়ের মাথা, ঘোড়ার খুর, শিশুর পাঁজরের হাড়, বানরের থাবা রাখলেন। বৃত্তচাপ এবং তারার পয়েন্টগুলো মিলে আরও ছয়টি কোণ তৈরি করেছে। এরপর এই কোণগুলোতে হালকা লাল রঙের কালি দিয়ে অদ্ভুত সব চিহ্ন আঁকলেন। নতুন একটা ধুতি বের করে আমাকে বললেন পরে নিতে। দুটো ত্রিভুজের মাঝখানে যে পেন্টাগ্রাম তৈরি হয়েছে, ঠিক সেখানে মোরগ দুটো জবাই করলেন। রক্তে মাখামাখি হলো জায়গাটা। শুকনো বালুমাটি খুব দ্রুত রক্ত শুষে নিল। এরপর সেখানে বাঘছাল বিছিয়ে আমাকে বললেন খালি গায়ে পদ্মাসনে বসতে।

হালকা লাল রঙের যে কালিতে চিহ্ন এঁকেছিলেন, সেই তরলের কিছুটা কাঠের মূর্তিটার ভেতর ঢেলে এক চুমুক খেতে বললেন। খেতে খারাপ লাগল না। ঘিয়ের গন্ধ পেলাম। মূর্তিটা ফিরিয়ে নিয়ে বাংলায় লেখা একটা সংস্কৃত মন্ত্র খুব ধীরে একশো চুয়াল্লিশবার পড়তে বললেন। মাটির মালসায় মরা একটা চড়ুই পাখি রেখে ঢেকে দিলেন সরা দিয়ে। কেরোসিনের স্টোভ জ্বেলে তার ওপর মালসাটা রেখে সবটুকু সলতে উসকে দিলেন। লাল গনগনে হয়ে উঠল মালসা। ঘণ্টা খানেক পর আঁচ কমিয়ে সরা যখন তুললেন, তখন দেখলাম, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে চড়ুই। এক চিমটে ছাই তুলে, যে তরলটুকু এখনো বাকি ছিল, তার সাথে মেশালেন মন্ময়। আমাকে বললেন পুরোটা খেয়ে ফেলতে। এইবার চড়ুইয়ের বাকি ছাইটুকু বৃত্তের চারপাশে ছিটিয়ে দিলেন। অন্য একটি কাগজ বের করে দু'লাইনের আর একটি মন্ত্র আমার হাতে দিয়ে বললেন আবারও একশো চুয়াল্লিশবার পড়তে।

মন্ত্র পড়তে শুরু করার পরই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে লাগল। মনে হলো, ঘরের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে গেছে। দেখলাম, মরু এলাকায় বিশাল এক পাথুরে মন্দিরে বসে আছি। পর মুহূর্তে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। দেখতে পেলাম, আদ্যি কালের এক বনের কিনারায় থান পরা শত শত টাকমাথা লোক শয়তানের বিকট এক মূর্তিকে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করছে। মূর্তির পায়ের কাছে পাথরের বেদিতে সাতটি তরু ণীর কাটা মাথা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বেদি, শয়তানের পা। হঠাৎ অনুভব করলাম, এক অপার্থিব কুৎসিত ঠান্ডা হাত দিয়ে কে যেন আমার হৃৎপিণ্ড চেপে ধরেছে। প্রচণ্ড ব্যথায় জ্ঞান হারালাম আমি।

হুঁশ ফিরে পেয়ে দেখি, সেই বুড়ো লোকটা আমার মাথায় জল ঢালছে। চৌধুরী তার সব জিনিসপত্র গোছগাছ করছেন। মেঝের ওপরকার নকশা উধাও। খুব ভোরে যখন বের হলাম, পাড়াটাকে মনে হলো ভূতের শহর। কোথায় হারিয়ে গেছে রাতের সেই মৌতাত। দুটো রিকশা নিয়ে গোয়ালন্দ বাজারে ফিরলাম আমার। ড্রাইভার রওনা হলো সাথে সাথে। পথে রাজবাড়ী বাজারে নেমে মুরগির ঝোল, নানরু টি দিয়ে নাশতা সেরে আবারও গাড়িতে।
বাসার সামনে আমাকে নামিয়ে দিলেন মন্ময়। হাতে খবরের কাগজে পেঁচানো একটা প্যাকেট আর একটি চিঠি দিলেন। বললেন,
'প্যাকেট সাবধানে রাখবেন। চিঠিটা ভালো করে পড়বেন।' ড্রাইভারকে বললেন,
'বাসায় চলো, জলদি।'

১২
বাসায় ফিরে জানলাম, মা বড় মামার ওখানে। গত রাতে তার স্ট্রোক করেছে। গোসল সেরে খেয়েদেয়ে বিছানায় শুয়ে চিঠি খুললাম। সুন্দর করে গুছিয়ে লেখা চিঠি। খুব সম্ভব চৌধুরী আগেই লিখে রেখেছিলেন। দিন, তারিখ কিছু উল্লেখ নেই :

সঞ্জয় বাবু,
আপনার সাথে আমার হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। তার প্রয়োজনও নেই। সাধনা কতটুকু সফল হয়েছে তা বোঝা যাবে তিন দিনের মধ্যেই। কাগজের প্যাকেটে কাঠের মূর্তিটা আছে। এটা একটা টাইম বম্ব। মূর্তিটার কাজ কার প্রাণনাশ করতে হবে, হাকিনীকে সেই ব্যক্তি চিনিয়ে দেওয়া। সেই অর্থে এটাকে হোমিং ডিভাইসও বলতে পারেন। টাইম বম্ব এই অর্থে যে সময় মাত্র তিন দিন। আজ রাতেই মূর্তিটা, যার ছবি থেকে ওটা বানানো, তার বাসার সীমানার ভেতর পুঁতে রেখে আসবেন। মূর্তিটা ভারী মনে হবে। এর কারণ, ওটার পেটের ভেতর আপনি যেখানে বসে যজ্ঞ করেছেন, সেখানকার মাটি ভরে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন করতে পারেন, যে তরল আপনাকে খেতে দিয়েছিলাম, সেটা আসলে কী ছিল? অনেক পুরোনো রেড ওয়াইন এর সাথে একজন বারবনিতার ঋতুস্রাব এবং কালীমন্দিরে যে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলে, সেই পিদিমের ঘি মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে ওটা। এসব কথা আপনাকে বলছি এই কারণে যে আপনি যেন না ভাবেন, আপনাকে বিষাক্ত কোনো কিছু খাইয়ে অসুস্থ করে ফেলেছি। ঋতুস্রাব খেলে মানুষ অসুস্থ হয় না। প্রাক ইসলামি যুগে মক্কার লোকেরা ঋতুস্রাব খেত। তাদের কোনো সমস্যা হয়নি।

আবারও বলছি, যত তাড়াতাড়ি পারেন মূর্তি দাফনের ব্যবস্থা নিন। শুভ কামনা রইল।

লেখকের নাম-ঠিকানা নেই। মোটা মোসলেমের নামের উল্লেখ পর্যন্ত নেই কোথাও। চিঠি অন্যের হাতে যদি পড়েও, মন্ময় চৌধুরীকে জড়ানো যাবে না কিছুতেই। সত্যি কথা বলতে কী, লোকটা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানিনা। এ হচ্ছে পিরামিড। সামনেই আছে অথচ চির রহস্যময়। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর। তলিয়ে গেলাম ঘুমের গভীরে। স্বপ্নে দেখলাম, বুড়ির বাড়ির সামনে আমি দাঁড়িয়ে। তার সেই বীভৎস বসার ঘরের সরু দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল মন্ময় চৌধুরীর সাথে মোটা মোসলেম। আমাকে দেখতে পেয়ে মুখ হা করল। তাদের খোলা মুখ থেকে অসংখ্য ছোট ছোট তির আমার গায়ে এসে বিঁধতে লাগল। আমি দাঁড়িয়েই আছি। কোত্থেকে বুড়ির নাতজামাই ছুটে এল। ধাক্কা মেরে রাস্ত্মার এক পাশে সরিয়ে দিল আমাকে। জেগে উঠে দেখি, বাসার কাজের ছেলে নিমাই আমাকে ঝাঁকাচ্ছে। ঘুম ভেঙেছে দেখে বলল,
'ও সঞ্জুদা, আপনারে তো মশা খায়ে ফেলালো। সেই ককুন সাঁজ হয়েচে। একুনও ঘোম পাড়তিচেন। ওটেন। আপনের বড় মামা মইরে গেচে। তেনার বাড়িত যাতি হবে। খপর পাটায়েচে।'

মাথায় আকাশ, সৌরজগৎ, ছায়াপথ সব ভেঙে পড়ল। আমরা জাতে হিন্দু। বড় মামার সৎকার করতেই হবে। যত রাতই হোক, শ্মশানে লাশ দাহ করা চাই। মূর্তি কখন দাফন করব, বুঝতে পারছি না। হায়রে সময়! সময় গেলে সাধন হবে না। ছুটলাম বড় মামার বাড়ি। মূর্তি পড়ে থাকল বেড-সাইড টেবিলের ড্রয়ারে। শ্মশান-মশান ঘুরে বাড়ি এসে লোহা-লবণ ছুঁয়ে পাকসাফ হয়ে যখন ঘরে উঠলাম, তখন সকাল আটটা। আবারও সেই রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা।

সারা দিন ঘুমালাম। বিকেলের দিকে হেঁটে হেঁটে মোটা মোসলেমের বাড়ির দিকে গেলাম। আহসান আহমেদ রোডে এক হিন্দু জমিদারের মেয়ের বাড়ি দখল করে বাস করছে মোসলেম। বাড়ির সামনে নিচু প্রাচীরঘেরা একটা ছোট বাগান। এককালে সুন্দর ছিল। এখন সেখানে চার-পাঁচটা কলাগাছ ডানে-বাঁয়ে হেলে আছে। বাড়ির রং ক্যাটকেটে হলুদ, জানালা-দরজা রয়েল ব্লু। মূর্তি দাফনের জন্য বাগানটাকেই বেছে নিলাম। রাত বারোটা নাগাদ দেয়াল টপকে ঢুকলাম ওখানে। ফুট খানেক গভীর গর্ত করতে হবে। কোদাল আনা সম্ভব হয়নি। ছোট একটা খুরপি এনেছি। বাগানে ঢুকে রাস্তার কাছাকাছি এক কোনায় গর্ত খুঁড়লাম। কাগজের মোড়ক সরিয়ে বের করলাম মূর্তিটা। হাতে নিয়ে মনে হলো, ভীষণ ঠান্ডা এবং অনবরত ঘামছে ওটা। মূর্তিটা মাটি চাপা দিয়ে উঠতে যাব, এমন সময় দুটো মোটরসাইকেল আসার শব্দ পেলাম। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হর্ন বাজাতে লাগল চালকেরা। জাগ দলের কর্মী মোটা মোসলেমের সাথে কথা বলতে চায়। দেখে ফেললে সর্বনাশের মাথায় বাড়ি পড়বে। পাঁচিল ঘেঁষে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম। ইচ্ছে হলো মাটিতে মিশে যাই। ভেবেছিলাম, লোকগুলো বাড়ির ভেতরে ঢুকবে। ঘটল এর উল্টোটা। বাসা থেকে বেরিয়ে এসে গেটের সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলতে লাগল মোসলেম। কথা আর শেষ হয় না। পাঁচিলের ওপাশে পৌর করপোরেশনের ড্রেন। মশাদের মহাদেশ। শরীরের ওপর চাদর বিছিয়ে দিল তারা। মনে হলো, অনন্ত কাল শুয়ে আছি। অসহ্য হয়ে উঠল মশা আর অদৃশ্য পোকার কামড়। সবকিছুরই শেষ আছে। কর্মীরা বিদায় হলো, মোটা ঘরে ফিরল। পাঁচিল টপকে আমি ফিরলাম বাসায়।

পরদিন বিকেলে চা নাশতা খেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড় ঘুরে হাঁটতে লাগলাম আহসান আহমেদ রোড ধরে। মনে প্রশান্তি। মিশন অ্যাকমপ্লিশড। দেখিব, খেলাতে কে হারে কে জেতে! মোসলেমের বাড়ির সামনে এসে খেলাম জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা। ধুন্ধুমার কাণ্ড। বাগান, কলাগাছ, পাঁচিল সব উধাও। পুরো জায়গাজুড়ে ফাউন্ডেশনের গর্ত। ওখানে নিচে মার্কেট, ওপরে জাগ দলের অফিস হবে। দুটো বাঁশের খুঁটিতে সাইনবোর্ড টাঙানো: দোকান-কোঠা বরাদ্দ চলছে। তিনটে বেডফোর্ড ট্রাক দাঁড়ানো। সারা দিন মাটি টেনেছে ওগুলো। এই বিরাট শহরে কোথায় মাটি ডাম্প করেছে কে বলতে পারে?

সন্ধে থেকে একটানা ডায়েরি লিখছি। মা মরা বাড়িতে। ন'টার দিকে নিমাই এসে খবর দিয়েছে খাবার রেডি। বলেছি রাতে খাব না। এক মহাজাগতিক হতাশায় ডুবে আছি। অপেক্ষা করছি চূড়ান্ত পরিণতির। হঠাৎ কারেন্ট চলে গেল। জানালার শিক গলে ঘরে ঢুকল কনকনে ঠান্ডা বাতাস। পর্দা ফুলে ঢোল। বাড়ির সামনে দেখতে পেলাম জমাট বাঁধা একতাল ঘন অন্ধকারকে। মনে হলো, আষাঢ়ি অমাবস্যার রাতে ডবল সাইজ গরিলা দাঁড়িয়ে। খুব ধীরে জানালার দিকে এগোতে শুরু করল ছায়াছায়া কিংকং। হাকিনী তার শিকার চিনে ফেলেছে . . . ।(শেষ)

লেখক - মুহাম্মদ আলমগীর তৈমূর
বিভাগীয় প্রধান
ইংরেজী বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
https://­­m.facebook.com/­­muhammad.toimoor?ref­i­d=52

শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১১

samoa joe interview

Samoa Joe was interviewe
d by AllWrestling.com on what I believe to be one of the longest interviews Joe has had in quite a while. Below is a quick recap of the interview.

First thing on the agenda that is brought up is that Samoa Joe's contract ends some time in 2012

he admits that he hasn't been used to the fullest of his potential. He does recognize that TNA is in a phase where they are building new talent.
Quote
its always extremely rough not to be in the title picture. i have had the ability to work for tremendous young talent. He puts over crimson as one person to watch. having a part in developing young talent is important.

The interview shift gears to Bruce Prichard now being the head of creative and the focus on original talent in the main event picture. Joe says he loves that and those guys really haven't been given a main event spot. Joe says he was put in the main event picture pretty early and they have been around just as long if not longer in storms case.

On whether he would jump ship to the WWE:
I think people believe that I'm on the cusp of being an extremely disgruntled employee. I've heard such wild rumors like that I've been sighted in Connecticut. I've had secret meetings, its all but done. A trade that sounds so ridiculously silly. That i despise what I do I'm still with TNA, we have a fantastic financial agreement. The relationship between me and TNA has always been great. I'm the type of person that really lives in the moment. I don't put too much into trying to build scenarios that are bad. As long as i get an opportunity to wrestle and wrestle great people then i have the greatest job in the world.

On Stone Cold saying WWE should sign Samoa Joe
That was one of the greatest compliments ever given to me in my career by far by one of the greatest athletes in this industry. Just hope that TNA sees that and we can take it from there. I'm big on loyalty. Some people are of the thought process that if you don't like something, you quit. You go somewhere else, you do something else. That's just not me. I think its silly, I think its shallow and taudry. I don't think I'm done with what I want to do in TNA.

On reading dirt sheets.
Not really but with twitter being the new social revolution that it is. just about every third or fourth post has something to do with the dirt sheets or about some outlandish rumor they have heard out there. Do i read the sheets? No. Alot of it is simply because 99% of it is not true. It's alot of speculation that isnt true. It's a business just like the wrestling business. If you don't have something compelling to write down there or for your newsletter or your website every week then you get no visitors. I can respect that. I don't even call them dirt sheets. They are newsletters with fans opinions on the wrestling business. I think that as long as the discussion of wrestling is in the hands of the fans and they are talking about it then something is right.

Questions quickly go from his performance in the Bound For Glory Series To MMA and Submission Wrestling
I work for a company that does TV wrestling. TV wrestling is very flash, bang, get it going. I've been told by many people in creative that those wrestling fans love the wrestling but its the other fans that don't understand what a wrist lock is etc. I have had my disagreements on this. I think that the art of professional wrestling speaks for itself. I think if you are a good enough professional wrestler you can tell your own story regardless of what extraneous feuds you have going. Fundamentally we may differ on that.

The popularity of MMA and bringing in submissions into professional wrestling.
Absolutely. With the more modern professional wrestling fan being far more educated. 99.9% of the wold knew what an armbar was in the 90's. I think that professional wrestling needs to evolve. There are some that may not feel that. I have argued my point. I make a stand here and there. At the end of the day the coach tells you how to play.

X-Division weight limits
when i heard that i think it shortchanged the division. I didn't like that. It does however provide a safe haven for guys like Austin Aries that will give them a spot on the show. Sometimes the X-Division wasn't being spotlighted because guys couldn't get their spot in and some of the matches weren't what fans would first think of as X-Divison matches. It does prevent some great potential matches from happening but it really only hurts guys outside of the X-division for now.

On his infamous shoot on Scott Hall During Turning Point 2007:
They limited me in that aspect. There was an incident where Scott Hall no-showed. They handed me the mic and said "Get him". That was what i was told. I went out there and got him. I ruffled a lot of feathers that day. In particular Kevin Nash. Kevin knew about the demons Scott was facing. None of us knew the extent of Halls issues.

The Scott Hall incident brings up Matt and Jeff Hardy.
I'm Ecstatic for Jeff. I've never seen him more healthy and look so much more alive. God Bless Matt. Matt is battling those same demons now. I hope and pray that he makes it through. At the end of the day wrestlers are human beings. These are real people, no matter how much you hate their antics. No matter how much they disgust you. As a person, as a responsible human being i would never wish death on these people. People that do are just far too immature to understand or are just heartless people. to listen to the whole interview go to the link below.
WWE TNA Week in Review - AllWrestling.com Podcast
WWE TNA Week in Review is one of the longest running Pro Wrestling Podcasts. WWE, TNA News

শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১১

tna impact wrestling results 1/12/2011

Impact Wrestling kicks off with a video package of Bobby Roode. It shows his entire family and what they think of him. They are not pleased with him at all. The video ends and the camera shows the arena. Just then, the music of Sting plays. Here comes the man in charge as he comes down the ramp and into the ring as the crowd roars.
Sting grabs a mic and begins to speak. He starts off by saying that there are a lot of people trying to take charge of this company, but Sting is in charge and he wants to talk to them. First, he calls out Bobby Roode! Roode’s music plays. Here comes the TNA World Champion! Roode slowly comes down the ramp as the crowd boos him. Just like his family, the fans aren’t pleased with him either. He gets in the ring and grabs a mic. He tells Sting that he is the world heavyweight champion. Roode says his calendar is filled as time is money, so he tells Sting to make it quick. Sting doesn’t care. Sting told Roode that it will be run his way, not Roode’s behavior. Sting says everyone is fine except for Roode. He then brings up Roode’s selfish ways by attacking people from behind. Roode talks back as he states it is good for television. He took out two people with his title…. “what an amazing way to go off the air,” Roode states. Roode then goes on to say that Sting only wanted him out there to say thanks to Roode for carrying this company and to bring it into the year 2012. Sting says he didn’t bring him out to say thanks. He tells Roode that for every bad thing Roode does, there will be even worse consequences! Just then, AJ Styles’ music hits and here comes the phenomenal one! He walks down the ramp as Roode is shocked and a bit nervous. Roode starts backing up in the corner as AJ gets in the ring. Roode says that Sting is fighting AJ’s battles for him. Sting says he isn’t done. Now, Jeff Hardy’s music plays and here comes….Jeff Hardy! He makes his way down the ring. He gets in the ring as the crowd cheers for him just like they did with AJ. Jeff gets in the ring as Roode can’t believe it. Jeff gets on the mic. Jeff says him and AJ respect Sting, but Roode doesn’t. Roode comes back and says “screw Sting and his decision making.” Sting says “screw you” to Roode as it will be Roode vs. AJ vs. Hardy tonight!!!! Tah Tah! Sting leaves the ring as his music plays. Roode is furious!
A camera is backstage from earlier and it shows the knockouts talking pretty loud. Karen Jarrett comes in and tells them to shut up. Karen mentions the Thunder Thong Match last week and Karen isn’t too happy about it as some people didn’t listen. Karen then states that the knockouts will wash six of the wrestlers’ cars. Karen wants them on their hands and knees getting every inch. They can do the rest later. The knockouts complain, complain, complain. Karen leaves and Madison Rayne shows off her stuff under her robe but then tells the others to take off their robe! She screams at them like always!
-Commercial
Jeff Hardy is backstage as he holds his shoulder. A camera man comes up to him asking him about his match later tonight. Jeff states that Roode is on his bad side while him and AJ will team up tonight. Just then, Jeff Jarrett comes into the shot as he starts yelling at Hardy. He tells Hardy to leave this company as he screwed up more times than any. Hardy tells him that this is his last shot. Jarrett asks if that is all he wants? Just then, Jarrett throws his coat at Hardy and then attacks him. He slams him into the wall and some furniture back there. Hardy comes back as he attacks Jarrett. Jarrett runs away.
Eric Bischoff is backstage as it’s a new camera shot somewhere backstage. Bully Ray walks up to him. Eric talks about his son as he can’t stand him and wants him out. Bully tells him that he will do whatever Eric wants involving Garett. Eric then goes on to talk about Abyss. Bully states that he put him through a table and popped right back up. No one has ever done that before. Eric says you need to talk to him and get into his mind. Bully says he will talk to Steiner about the situation. Eric and Bully shake hands. Bully leaves.
A video package plays showcasing Roode once again as his family talks about him. They have no idea what is going on with him.
-Commercial
The knockouts are in the parking lot washing cars. Tara is totally against this though as she didn’t take off her robe. She then takes it off after some convincing. ODB comes into the shot where Karen talks to her. Karen states that ODB will go against Mickie in a Street Fight and if ODB can take her out, then she will be the #1 Contender for the Knockout Title.
The camera goes to the ring as Ink Inc. come on stage. The crowd cheers. They get into the ring. After them, Mexican America come out. It’s all of the faction too. They go to the ring as the crowd boos. After them, Devon and Pope walk out together. They run down the ramp and slide into the ring.
Ink Inc. vs. Mexican America vs. The Pope and Devon in a Three Way to be the #1 Contenders for the TNA Tag Team Titles
The match begins and everyone goes after attack. While all of the teams go at it, slowly one leave the ring at a time. Pope and Devon are the last men standing in the ring. While Pope stays in the ring, his opponent comes in. Pope keeps the advantage as he attacks Jesse Neal. Jesse goes back and Anarquia tags himself in. He gets in but the Pope continues the momentum. Anarquia changes it as he knocks Pope out of the ring. Just then, Hernandez closelines him down on the outside. Pope gets back in and now he is on the defensive side. Hernandez tags in and he takes it to Pope like no tomorrow. He does multiple offensive powerhouse moves. He tags in Anarquia and he does some offensive as he works on the arm of Pope. He tags Hernandez back in and he comes back with power, but Pope reverses and closelines Hernandez. Both crawl to their own corner. Anarquia gets tagged and so does Devon. Both enter and Devon attacks Anarquia like he was nothing. Hernandez climbs up the top rope, but Devon takes him over. As Hernandez gets up, Neal tags himself in. He gets in and goes for the spear, but Devon moves and Neal hits Hernandez. Devon then attacks Neal and gets the win. Winners: The Pope and Devon
Austin Aries is walking backstage moving his head back and both like the cocky man he is. He is coming to the ring next!
-Commercial
The show returns and Austin Aries’ entrance music plays. Here comes A.A. down the ramp with the X-Division Title around his waist. The crowd boos him! He gets in the ring with his cocky smile, sunglasses, and title. Austin gets on the mic and tells everyone to be quiet. He then tells them to boo loudly. Austin goes right into his problem that he has. Austin said that he was the greatest man to ever life. A.A. succeeded his own expectations. He had a plan when he came to TNA and that was to make the X-Division better. Austin says his level of greatness is a whole different league compared to the others. Austin said he beat every X-Division wrestler here, so he states that they should call the division….the A.A. Division. Austin goes on to compliment himself in the sport of wrestling and his looks. Just then, music plays and it’s Kid Kash! Kash walks down the ramp. While he does, Austin tells him to hold on. Kash gets in the ring and right in the face of Austin. He then takes his mic. Kash questions if he heard Austin correctly about beating everyone in the division clean. Kash said they had an agreement to take out Sorensen, but there was no agreement afterwards. Kash then brings up last week’s match. Kash says he is confused on what A.A. is saying. He tells Aries to make it more clear. Austin says that Kash confused him with Jesse. Austin says he is champion. He then asks where is Kash’s belt. Kash says he worn that title longer than anyone before Austin came here. Austin takes off his title, lays it on the mat, and then tells Austin to shake his hand…and if he does, he will get a title shot. Kash puts down his mic after Austin did. Kash shakes his hand. Austin smirks…and then goes to punch Kash, but Kash gets the hand in first as he knocks down Austin. Aries grabs his belt and quickly leaves the ring as he holds his mouth.
Gunner is somewhere. He goes into some building as he calls out Garett. Where is he?
-Commercial
AJ Styles is in the locker room as he is getting ready. The camera man says AJ has his hands full tonight. AJ agrees and says Roode is on the top of his game, but so is AJ and he will show Roode what he is about.
Gunner is seen in a gyms. There is someone working out. He gets in the face of Gunner. The guy says it’s not his turn to watch Garett. Gunner pushes him over with ease. Gunner goes to another room. This guy gets attacked by Gunner too. He throws the guy into different things in the gym. Someone comes up to Gunner, but Gunner attacks him. Some guy in the ring talks to Gunner, but Gunner doesn’t want to hear him. He gets in the ring and throws the guy around with pleasure. He gets out and the guy he first saw comes back up to him. Gunner attacks him and then someone else who is quite bulky. Gunner puts him on the ground and works on his arm. “Where is Gunner,” Gunner asks!
Sting is backstage talking to Jeff Jarrett. Jeff tells Sting about Hardy and how he doesn’t want him in this business as he ruined it during the spring-summer. Sting tells Jeff not to get involved in the match tonight. Otherwise there will be consequences. Tah, Tah! Sting leaves.
A video package plays that shows more of Roode and his cheating ways. It has his wife on there talking about Roode and his children as they ask their own mom why their dad would cheat.
-Commercial
The knockouts are backstage as they are really getting into the car washing theme. Madison is directing the others, which starts to get them annoyed.
Bully Ray comes into Steiner’s locker room. Steiner starts yelling about how it’s a private room. Steiner then calms down and Bully talks about Abyss. Steiner says that Abyss is a pure bread American and that means he wants girls, but more so freaks. Bully and Steiner talk about freaks they know. Steiner then sprouts an idea as he leaves and Bully follows after taking a swig of something.
Christy Hemme is in the ring as she announces the next match. ODB comes on stage. The crowd cheers. Just then, Mickie James’ music plays and she comes on stage. Just then, ODB spears Mickie on the stage.
ODB vs. Mickie James in a Street Fight
The bell sounds and ODB has all of the momentum. She gets Mickie up and throws her in the railing and beats her down. She then gets Mickie in the ring. ODB enters, but Mickie comes back and pushes ODB in the corner. ODB then gets out and attacks Mickie. Mickie goes into the opposing corner. ODB runs to her, but Mickie slides out of the ring and ODB goes right into the corner. Mickie gets ODB out of the ring. Mickie knocks her down and covers, but ODB kicks out. ODB comes back as she puts Mickie in the steel steps and then the steel guard rail. Mickie holds on and tries to kick ODB, but ODB lifts her up and power bombs her on the outside mat. ODB is in total control. She drinks some water (that’s a first!) Mickie goes through the crowd. ODB follows her. ODB gets her up, but Mickie slams ODB right into the wall. It put a hole in it. ODB comes back and attacks Mickie. They go backstage more as ODB hits Mickie in the back with a trashcan lid. She then hits Mickie in the head with a trashcan. She covers Mickie, but Mickie kicks out. ODB then plants a tray right into the head of Mickie. Mickie is falling apart. ODB brings her back more and pushes her against some walls. Mickie pushes ODB back to regroup. Just then, she hits ODB with a broom. ODB walks away as Mickie follows. ODB then grabs the weak Mickie and slides her in the ring. ODB brings a chair in the ring. ODB goes for it, but Mickie does a roll-up. ODB kicks out. Mickie is coming back with several offensive moves. She is gaining momentum. Mickie drops ODB down and covers, but ODB kicks out. Both get up and Mickie goes for her finishing DDT, but ODB reverses it with a fallaway slam. ODB then grabs the chair. Mickie slowly gets up. She turns around, ODB swings, Mickie ducks, and then does a roundhouse kick to the chair which hits ODB right in the face!! ODB falls instantly and Mickie gets the pin. Winner: Mickie James
The camera shows James Storm getting a mic set-up on him as he is sitting in his home. It looks like he is going to speak next!
-Commercial
Taz and Mike Tenay are shown on the camera as they speak to James Storm. Storm states that he feels like he is getting better each day and week. James says he is not cleared to wrestle yet, so he doesn’t know when he will be back. James says the first person he wants is Kurt Angle. Just then, Kurt comes out and gets on the headset to ask James some questions. Kurt asks James how he feels with his head bashed in and to have his daughter know. James says Kurt will know once James is cleared. Kurt says James robbed him out of the title. Kurt then gets inside James’ mind and Storm says that he will be here next week to go after Kurt! Kurt throws the headset down and leaves.
Two pretty young girls are walking backstage. They can’t wait to meet a wrestler as wrestlers have those great bodies from top to bottom. They know this is going to be good. The two girls continue to walk, but they don’t know what is in store for them! Steiner and Bully have their verdant people!
A video plays talking about Roode with his family’s commentary.
-Commercial
The show returns and a video plays. It goes back to Bound for Glory this past year. It has Roode talking about his loss to Kurt and how it brought him down. It shows his family talking about Roode’s cheating ways all of a sudden to win the title. They don’t know why he did it. Roode says that he is putting the food on the table and paying the bills. He says it is his time. Roode will do what he wants. No one knows Roode anymore.
Roode is backstage as he talking about his family and the wrestlers. He says they are all users….users of him. They are using him. Roode states that AJ and Hardy have nothing like him. Roode is at the top of the mountain!
Christy Hemme is in the ring as she announces the next contest. Rob Van Dam’s music hits and here comes RVD! The crowd cheers as he comes to the ring. Rob Terry walks out with Robbie E. Robbie has the title around his waist. The crowd boos them as they get in the ring.
Rob Van Dam vs. Robbie E. (Champ) for the Television Title
Rob leaves and and the match begins. Both look at each others. They then start to taunt and mock each other’s taunts. Rob smles and kicks Robbie, which knocks him back and into the corner. RVD puts Robbie in the opposing corner and does a great monkey flip. Robbie gets up and is closelined out of the ring. RVD does a baseball slide and Robbie goes right into Rob. RVD then mocks Rob Terry as Robbie gets back in the ring. RVD knows it and kicks Robbie, which knocks him down. RVD does rolling thunder and then goes for the 5 star frog splash, but Rob Terry distracts RVD. Robbie gets up and attacks RVD. Robbie is now in control as he knocks down RVD and puts knees right into the body. Robbie gets RVD up and whips him in the corner. He runs, but RVD kicks Robbie in the face. He comes out and Robbie whips him back. This time, RVD comes out of the corner as he does a spinning heel kick. Robbie gets up and throws RVD out of the ring. Just then, Eric Young runs down the ramp with some type of weapon in hand. Robbie watches from the ring while Rob blocks off Eric. RVD gets back in and does a kick to the face. RVD does the 5 star frog splash and goes for the cover, but the referee is outside to get Eric Young away. Just then, Daniels enters and hits RVD with the angle wings. Robbie turns him over for the cover. The referee gets in and counts to three. Winner and Still Champion: Robbie E.
The camera is backstage as the two young girls Bully and Steiner sent in are messed up as their hair is all over the place. They are dazed and confused as they ask each other what just happened. They hold their heads as they walk away.
-Commercial
The show shows the knockouts cleaning cars still. They are starting to get enough as Madison is directing traffic. Just then, Tara starts to get mad at Sky. Tara starts to attack her. Just then, every knockout goes after each other with the sponges and water. The wrestlers like Pope come over to either look at their cars or watch the action. The fighting does not stop with the knockouts.
Jeff Hardy’s music plays and he comes out. The crowd cheers as he comes to the ring. After him, AJ’s music hits and he comes down the ramp. The crowd goes wild for him. After he is in the ring, Bobby Roode’s music airs. He comes on stage with the TNA World Title around his waist. He raises his arms and fireworks shoot in the air. He slowly makes his way down the ramp as the crowd boos. Roode gets in the ring as Jeremy Borash does the introductions.
Jeff Hardy vs. AJ Styles vs. Bobby Roode
The bell sounds and the match begins! Each are in a corner and them move around. Roode quickly slides out and he tells Jeff and AJ to start the match. AJ and Jeff look at each other. AJ then goes on the apron where Roode is going to walk. Roode backs up. AJ then is on the outside as he walks closer to Roode. Jeff gets out and sandwiches Roode in. They attack him until he falls down. They get him up and slide him in the ring. Roode tells AJ to get away, but he forgot about Jeff as he is right behind Roode. Jeff does multiple shots to Roode. AJ comes in and they double team Roode with a double back drop and then double closeline. Roode is out of the ring now. Jeff goes for the flying cross body over the ropes, but AJ says he will do it. He does it, but Roode moves. AJ lands on the apron and Roode holds onto the leg of AJ. Jeff does a baseball slide and Roode goes back. Both AJ and Jeff attack Roode again!
-Commercial
Roode has the advantage as he is attacking AJ in the corner. Well, AJ is coming back, but Jeff is getting on the apron and is knocked off by AJ getting whipped. Roode then does a back suplex to AJ and is back in control. Jeff gets in and Roode goes after both stars. He goes to Jeff then to AJ and then to Jeff, but Jeff puts Roode in the corner and punches the hell out of Roode. Aj comes over and attacks Roode too. Roode pokes the eyes of AJ and then slaps Jeff, but Jeff thinks the slap to the back of the head was AJ. AJ and Jeff stare at each other and then push and shove. Just then, they go after each other. AJ does a back body drop, a cover, but Jeff kicks out. Both get up and Jeff does a spinning kick, a side russian leg sweep and then a cover, but AJ kicks out. Both get up and AJ does a pay lay. Jeff is down and out. AJ gets up, but Roode gets in and pushes AJ shoulder first into the steel ring post. Roode stomps on Jeff and then elbows him in the chest. He covers, but Jeff kicks out. Roode gets Jeff up, puts him in the corner and punches him, but Jeff comes back with some punches. Roode pushes Jeff in the ropes and knocks him down with an elbow and then drops a knee to the face. AJ tries to come in the ring, but Roode does a baseball slide right into AJ. It knocks him down. Roode is in control!!! Roode goes right to Jeff to attack him and weaken him more. He gets Jeff up but Jeff comes back with some punches. Roode lifts Jeff up and hits the spine buster. Roode covers, but Jeff kicks out!!!!
Roode gets Jeff up, but AJ springboards and knocks Roode off his feet. AJ comes back, but Roode whips him in the corner. AJ stops in his tracks, jumps up and does a moonsault as he grabs Roode and does a reverse DDT. AJ gets Roode up for the styles clash, but Roode lifts AJ up and puts him on the apron. Jeff gets up and Roode pushes Jeff back while AJ jumps on the ropes. AJ falls right on the ropes while Jeff is down. Suddenly, each are in the ring while Jeff attacks Roode with a closeline, dropkick and whisper in the wind. He goes for the swanton bomb, but Jeff Jarrett runs out and distracts Hardy. Hardy falls on the corner. He flips over and lies on the mat. Roode covers and gets the pin before AJ an break it. While Jarrett is walking up the ramp while Roode is in front of him….Sting’s music hits!
Sting comes out and says that there will be consequences…..and that is Jeff Hardy vs. Jeff Jarrett at the PPV….in a Steel Cage….and if Hardy losses, he will leave the company, but if Jarrett losses, then Hardy becomes #1 Contender for the title. Karen then ones on stage as she starts screaming at Sting that he can’t do that and who does he think he is……Sting then states that Jeff Jarrett’s “husband” won’t interfere in the match because Sting will handcuff himself to Karen. Karen starts to scream, shout, and yell. Sting mocks her cry baby ways as Roode and Jeff Hardy look on. The show fades.

বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১১

Tuesdays Live Holiday Smackdown Results




Tonight’s WWE Super SmackDown special opens with a shot of downtown Charlotte and they have snow falling on the screen. We go to the arena and snow is falling there also as Mick Foley makes his way out dressed as Santa Claus. Foley talks about how he’s a huge fan of Christmas and points out we’re still 4 weeks away. Foley talks about tonight’s World Heavyweight Title match in the steel cage. Foley also announces a Street Fight and a Battle Royal. The winner of the Battle Royal will get their special wish granted by Santa. Foley says he promised no Michael Cole tonight but Cole’s legal team got him on the show. Foley brings out Michael Cole and he’s dressed as Rudolph the Reindeer. Cole isn’t happy and runs his mouth on the way to the ring.
Cole joins the announcer table and we see Josh Matthews dressed as an elf. Foley brings out Booker T next and he’s dressed as Santa Claus also. Foley talks Booker into doing a Spin-a-rooni. Foley plays some cheesy music and Booker Claus does the Spin-a-rooni. Intercontinental Champion Cody Rhodes comes out to the stage. Cody rips into Booker and says he’s taking time away from someone like him who still has the skills to compete. Booker says he doesn’t know what Cody’s problem is but he has no beef with him. Booker says he doesn’t want to fight Cody either but he can still handle his business in the ring. Cody shows off his title and says Booker will never be champion again. Foley speaks up and tells Cody not to disrespect a Legend. Foley is proud to call Booker a friend. Foley calls Booker a 5 time WCW Champion and says Cody is interrupting his enjoying the holidays. Foley proposes Booker vs. Cody tonight. Cody says he’s looking forward to it but Booker looks a little hesitant. Booker agrees. Foley has a party to get back to in the back but introduces the Divas.

Mistletoe Match

The Bella Twins, Tamina, Natalya, Kelly Kelly, Rosa Mendes, Alicia Fox, Kaitlyn, Aksana and some other Divas make their way out to the ring as we go to commercial.

Back from the break and Foley is on the stage. He announces this is a Mistletoe match and the winner gets a title shot it sounds like. The winner has to climb the pole and grab the mistletoe to win. The bell rings and all the Divas go at it. The end comes when Brie Bella hits her sister Nikki and climbs up on her back to grab the mistletoe.

Winner: Brie Bella

- Foley comes back out and says the winner does not get a title shot. They get the chance to give a kiss to any Superstar of their choice between now and Christmas.

Justin Gabriel vs. Jinder Mahal

Back from the break and Justin Gabriel is in the ring. Jinder Mahal comes out and rips into the fans for celebrating Christmas. The bell rings and they go at it. Mahal takes control early on and works Gabriel over. Mahal spears Gabriel in the corner and whips him across the ring. Ted DiBiase’s music hits and out he comes in a Santa hat with a Santa bag. Ted starts handing out gifts to the fans. Mahal runs his mouth to Ted. He turns around to a kick from Gabriel. Gabriel slams Jinder and goes to the top for the 450. Gabriel nails it for the win.

Winner: Justin Gabriel

- We go backstage where Mick Foley is making the rounds at the Christmas party. Roddy Piper is there. Dusty Rhodes walks in and talks with Hornswoggle. Dusty turns around and Goldust is there. Piper is telling Johnny Curtis to spike someone’s drink with eye drops if he has a problem with them. David Otunga walks up and advises against it. Otunga has a message from John Laurinaitis and wants everyone to shut the party down. Foley books Otunga in the Miracle on 34th Street Fight. And his opponent is… Randy Orton. Otunga looks worried as we go to commercial.

- We get more hype for Booker T vs. Cody Rhodes. Matt Striker is backstage with Booker. He goes to speak but Cody Rhodes attacks him from behind with the Intercontinental Title. Cody hits Booker again and walks off as a referee tends to Booker. Back to commercial.

Kofi Kingston vs. Tyson Kidd

Back from the break and Tyson Kidd is in the ring while Kofi Kingston makes his entrance. Cole announces that Rhodes vs. Booker T will not happen tonight because of the attack from Rhodes. The bell rings and they go at it. Kofi with offense early on. Tyson knocks him out of the corner and dropkicks him for a 2 count. Kidd keeps in control and stops Kofi from making a comeback.

Kofi comes back with forearm shots and a big dropkick. Kofi with the leaping forearm and the Boom Drop. Kofi goes for Trouble in Paradise but Kidd rolls out of the ring. Kofi follows. Kofi ducks a clothesline and dropkicks Kidd on the floor. Kofi goes over to Michael Cole and tells him to take the reindeer suit off because he looks ridiculous. Kofi turns around to a shot from Kidd. Kofi rocks Kidd into the apron and rolls him in the ring. Kofi goes to the top with Cole’s reindeer hat and nose on. Kofi the reindeer hits a big crossbody from the top for the win.

Winner: Kofi Kingston

- We go backstage to the Christmas party. Kaitlyn suggests Hornswoggle ask Santa if he can be a little bit taller. Sheamus and Teddy Long talk about tonight’s All I Want for Christmas Battle Royal. Sheamus wants to know what the winner gets but Teddy doesn’t know. Aksana walks up and Teddy asks Sheamus to excuse them. Teddy and Aksana talk about the Christmas party. She hangs mistletoe over his head. He tells her to do what comes natural. She doesn’t kiss him… instead she eats a piece of the mistletoe and says it tickled her throat. They leave together and that’s it.

- We see Randy Orton walking backstage to the Miracle on 34th Street Fight. Back to commercial.

Miracle on 34th Street Fight: Randy Orton vs. David Otunga

Back from the break and out comes Randy Orton followed by David Otunga. The bell rings and Orton applies a headlock. Orton drops Otunga with a shoulder but gets kicked in the gut. Orton kicks Otunga in the head and clotheslines him out to the floor. Orton works Otunga over on the floor now and throws him into one of the Christmas trees at ringside. Orton throws Otunga into another tree as the crowd cheers him on.

Otunga rams Orton back into the apron. Orton takes a pan of Christmas cookies and hits Otunga with it. He wraps a wreath around Otunga’s head and continues the assault. Otunga turns it around and suplexes Orton on the floor. Otunga swings a kendo stick wrapped like a candy cane but Orton tackles him and takes back the fight on the floor. Orton beats Otunga around the floor and up the ramp. Orton throws a huge box wrapped as a present and knocks Otunga down. Orton takes Otunga up the ramp where several Christmas trees are setup and throws him into them. Orton brings it back to the ring and hits the draping DDT from the apron down to the floor outside the ring. Orton gets up but Wade Barrett runs down and attacks from behind. Barrett shoves Orton into the ring post and drops him with a big boot. Barrett brings Orton in the ring and throws Otunga in. Barrett walks off as Otunga pins Orton but he kicks out at 2. Otunga stomps away in the corner now.

Otunga with shoulder thrusts in the corner now. Orton fights him off and hits a pair of clotheslines followed by the scoop slam. Orton nails the RKO for the win.

Winner: Randy Orton

- Teddy Long walks in on Mark Henry backstage and asks him if he’s in the Christmas spirit. Henry gets pissed and blames everything on Teddy. Henry says he will take care of Big Show at TLC but tonight will destroy Daniel Bryan. Henry says he is in the spirit of giving and will give Bryan a beating tonight. Henry tells Teddy to get out of his face and Teddy does.

- We see footage from last week of Daniel Bryan attempting to cash in. More hype for tonight’s main event as we go to commercial.

All I Want for Christmas Battle Royal

Back from commercial and several Superstars are in the ring. Hunico comes out next followed by Sheamus to a big pop. Hornswoggle is out next and apparently he is competing in the match. Hornswoggle goes under the ring as the match begins. Sheamus eliminates Darren Young and one of the Usos. JTG is also eliminated and others.

Sheamus and Ezekiel Jackson have words and start brawling in the middle of the ring. Zeke charges but Sheamus dumps him over the top. Johnny Curtis is tossed by Sheamus next. Kofi eliminates the other Uso. Kofi is eliminated next as is Yoshi Tatsu. Tyson eliminates Ted DiBiase. Hornswoggle comes from under the ring and eliminates Tyson. Back to commercial.

Back from the break and we’re down to 7 Superstars. Jinder eliminates Gabriel. Titus shows off and gets eliminated by Sheamus. Sheamus turns around to an attack from Heath Slater and Jinder while Hunico goes at it with Tyler Reks. Sheamus unloads on all three but gets attacked by Reks from behind. Sheamus tackles Reks. Reks crawls under the bottom rope and they fight on the floor. The other three follow and they beat Sheamus down outside of the ring. The 4 heels get back in the ring and Mahal’s mouth is busted open. They all motion under the ring where Hornswoggle is. They go crawling under the ring and out comes Hornswoggle. Mahal throws him in the ring and they surround him. Slater throws Hornswoggle to the mat as does Hunico. They start kicking Hornswoggle around and mocking him. Mahal grabs Hornswoggle’s feet as Reks grabs his arms. They swing him to toss him but Sheamus makes the save. Out goes Reks, followed by Hunico and then Mahal. Sheamus Brogue Kicks Slater over the top. It’s down to Sheamus and Hornswoggle. Hornswoggle tells Sheamus to bring it on. Sheamus smiles and tells Hornswoggle to go over the top rope but he won’t. Hornswoggle tries to hit Sheamus but he’s not having it. Sheamus picks Hornswoggle up and tries to set him over the top rope. Horny just hangs on to the top rope with his feet and legs. Sheamus tries nicely to eliminate Hornswoggle but he won’t go. Sheamus tells Horny one more time to get off the apron and eliminate himself. They discuss it on the apron. Hornswoggle wants a hug and when he gets it, he pushes Sheamus off the apron to win.

Winner: Hornswoggle

- After the match, Sheamus comes back in the ring and corners Hornswoggle. Sheamus reconsiders and raises Hornswoggle’s arm. Sheamus puts Horny up on his shoulders and congratulates him. Sheamus heads up the ramp as Horny continues his celebration.

- We get a plug for the SyFy miniseries Neverland. Cole shows us footage of the four-way on SmackDown last Friday where Daniel Bryan became the #1 contender. More hype for tonight’s main event as we go back to commercial.

- Back from the break and The Bellas are talking to Ricardo Rodriguez at the Christmas party. Piper and Dusty are also chatting. Foley Claus walks up and talks with Hornswoggle about what he wants. Sheamus walks up and says Hornswoggle wants the ability to talk. Foley hugs Hornswoggle and he starts talking normal. Horny is super excited about being able to talk. Foley appears in his Cactus Jack shirt and they imply that the real Santa Claus was here.

- Daniel Bryan is warming up when AJ Lee walks up and wishes him good luck. She kisses him before walking off. Matt Striker walks up for pre-match comments. Bryan say sooner or later, everyone taps. Tonight, his dream becomes a reality. Bryan grabs the briefcase and walks off as the cage is lowered from the ceiling. Back to commercial.

Steel Cage Match for the World Heavyweight Title: Daniel Bryan vs. Mark Henry

Back from commercial and out first comes Daniel Bryan. Mark Henry is out next and his ankle is wrapped. We get formal ring introductions and then the bell. Bryan immediately tries to climb the cage but Henry stops him. Bryan goes for it again but can’t make it up. Henry takes control but Bryan goes for his leg. Henry lays Bryan out as we go to commercial.

Back from the break and Henry is still in control. During the break, Henry used the ropes to slingshot Bryan into the cage wall. Henry keeps Bryan grounded on the mat now. Bryan tries to come back but Henry stops him. Henry tries to leave through the cage door but Bryan stops him. Henry turns around and levels Bryan with a clothesline. Henry with a 2 count. Henry goes for the door again but Bryan grabs his leg. Bryan takes Henry off his feet and stomps away on the injured ankle.

Bryan climbs the cage but Henry pulls him down onto the top rope. Henry with another big clothesline. The cage door is shut again as Henry continues to control Bryan but favor his injured ankle. Henry goes for a slam but Bryan slides out and takes the leg out again. Bryan locks in the LaBell Lock but Henry fights out. Henry goes for a powerbomb but his ankle goes out. Bryan applies the ankle lock on Henry. Henry rolls through and kicks Bryan across the ring. Bryan climbs the cage again but Henry pulls him down. Henry climbs the cage now but Bryan stops him in the corner. Bryan climbs up over Henry’s back and makes it to the top of the cage. Henry pulls Bryan back down by his arm and they go at it on the top rope. Bryan tries to hurricanrana Henry but Henry goes for a powerbomb. Bryan uses that to make it back to the top of the cage. Henry pulls him back to the top rope and hits some headbutts. Henry hits a World’s Strongest Slam from the top rope for the win.

Winner: Mark Henry

- SmackDown goes off the air with Henry holding the World Heavyweight Title.

Monday Night Raw Super Show Results

Monday Night Raw Super Show Results

We start the show right away with Rowdy Roddy Piper!! He comes out in full kilt and unbuttoned white shirt, topped with a lovely black button up…ok His fashion statement screams “Old Loony” and I love it! In the ring, we’ve got two stools and some microphones. Roddy gets a nice welcome from the crowd. Roddy has a question: how does a guy that has never won the WWE Championship, that was never the strongest or biggest become a Hall of Famer and one of the biggest icons in the history of the WWE Universe? Answer: ENERGY! He blames us. He’s not kidding, it’s us and the energy that we give him. WE made him feel good, so he did good things. When we booed him, we made him feel bad…so he did bad things. Fact is though, it’s our energy that makes him go to work. Tonight, we have a man in the building that is not sure if our energy is important so he is here to find out. Ladies and Gents, Mr. John Cena.

Cena and Piper introduce each other and The Pit. Cena questions Piper’s question in regards to the energy of the fans not being important. Piper wants to give an example. He asks the fans first to play word association. He is going to say a name and they respond. Stone Cold Steve Austin: CHEERS!!! Bret “The Hitman” Hart: CHEERS!!! The Rock: CHEERS (some lil boos). John Cena: Divided, of course. Although, the crowd eventually starts a Cena chant which means the crowd is quite pro-Cena. Cena says he sees what Piper is triyng to do. Piper says what he’s trying to do is help Cena. Ah, there’s the boos. Piper says that when all the people were yelling to The Rock to rock bottom Cena, and he did, the crowd came unglued. Cena says, he knows, he was there. The crowd starts a Boots to Asses chant. Cena knows what Piper is doing, but this isn’t the first time something like this has happened. Cena knows that there is a group of people who know who he is and what he stands for and he is loyal to them. He also knows that you can’t please everyone. There are people that want to tell him to go to hell. THAT is what makes the WWE energy that Piper is talking about. The fans can do what they want.

Piper says no, Cena can do what he wants and the fans will allow him to. What Cena is doing is not caring. Piper says Cena is the face of the WWE and the booing is getting louder and louder and louder and Cena is losing it. Cena is losing it. You know what’s going to happen? If Cena don’t suck it up and start telling the people what Cena think, then Cena will be the loser of the biggest Wrestlemania in history. Cena says Piper is going a little overboard. Let’s go back to Mania 22 when everyone loved him. Or how about the Hall of Fame show when the audience loved him then. Or, ECW One Night Stand…they totally LOVED HIM! Piper tries to shut him up, but Cena says that Survivor Series was just excited and New York was just being New York. The Rock had a great night…one…great…night! They show some kids in the crowd doing the You Cant See Me thing and Cena says that’s what he’s doing it for. He sees kids, Armed Services and various others having the time of their lives. Cena wants Piper to read the shirt Cena is wearing. THIS is why the boos will never get to him and this is why he can walk into Mania and if they like him, great, and if they hate him, whatever. The point is, he can beat The Rock at Mania. That’s energy.

Piper knows this. He’s come a long way to have Cena in Piper’s Pit and this is why. He’s watched Cena’s career and he’s proud of him. It was HIS generation that passed the torch to Cena and Cena rose the bar. Piper knows that every day Cena is stepping up to the plate and taking on all comers. Every day he’s saying hi to the armed forces and little kids, but how much energy can he tap into because he’s seen it all and done it all. He hands Cena the hall of fame ring and calls him a future hall of famer. If Cena doesn’t get it right with the people, he will be in denial and it will kill his chances for everything. Cena says he’s in a good place. Piper says no he ain’t and slaps him in the face then says to FEEL THE ENERGY!!! Cena removes the hat, he grabs the hand and gives him the ring back and walks out of the ring. He is, apparently, rising above the hate?

There’s a recap of what The Miz did to R-Truth last week before showing a backstage clip of Alex Riley and John Morrison talking in the back about Melina, and her pliability….ok, no they’re not, but they are talking.

Match 1: Falls Count Anywhere Match John Morrison vs. The Miz
Before the match officially starts, The Miz comes from behind and bashes the knee and right leg of John Morrison. He goes to town on it by banging over and over and it looks like we are not having a match.

The Miz walks slowly to the ring and asks for the mic. Morrison looks like he still wants to fight. He’s walking towards the ring. The Miz looks at Morrison like I look at Big Daddy Dudley; weak. The bell rings and we start the match. Miz goes for the leg but Morrison atacks the head. Miz, from the ground, kicks the knee of the right leg then goes to town on the leg. He pulls it towards the ring post and slams the leg against the post. Again! Miz goes under the ring, and he’s got a stick from Kendo! He cracks it against the leg of Morrison. He goes for a headshot, but Morrison ducks and hits a clothesline. Morrison with the kendo stick and he goes to town on The miz, back, chest, leg, gut, shoulder! He covers on the ramp for the 1…2..NO!!! Miz is crawling up the ramp, trying to get outta dodge as Morrison walks up the ramp, using the kendo stick as a walking stick. How creative. Morrison is at the top of the ramp and Miz trips him, pushing him head first into the corner of the swoosh under the big WWE sign. He sets up for the Skull Crushing Finale, hits it. He doesn’t even need to cover as the ref calls for the end of the match
Winner: The Miz (*)
Not really much to say here as it appears this is Morrison’s exit and it pushes The Miz as a bad ass.

The Miz ain’t done yet! He comes back out with a mic. He’s got what King calls an “ice cold gaze” as he walks down the ramp. Also, not sure how important this is, but Ace came out for a small amount of time to tell Morrison that he wishes him the best…The Miz says that last week, it was R-Truth. This week, it’s John Morrison. Next week, we’ll see. There’s only one superstar that can make this kind of impact, this kind of statement. That person is The Miz and he can do it because he’s……AWESOME! (To be read in a soft voice, please).

Match 2: The Bella Twins vs. Alicia Fox and Kelly Kelly
We are starting with Kelly and….Bella 1. We’ve got a distration. Beth and Natalya come running out in sports bras and yoga pants, running around the ring then back up the ramp…ooook. Back in the ring, Kelly is slappin one of the twins. We get a spinning head scissors and Alicia tags Kelly as Bella 1 lands in the corner. Bella 2 runs in and drags Kelly out. Alicia with a pull of the leg, faceplanting one of the Bellas then a flipping leg Drop and a pin by Alicia for 1…2…3!!!
Winner: Kelly Kelly and Alicia Fox (*)
-yawn-

In the back, Johnny Ace is telling Brodus Clay one more week. Here’s brown nosed David Otunga questioning making Brodus wait and Ace says that the more aggressive Brodus is, the better his re-debut will be. Del Rio walks in as Ace wanted to see him. Del Rio says he is ready for tonight and what happened at Survivor Series was just a setback. Here’s CM Punk. He says 156,000. 156,000 is the number of hits you get when you type in “Laurinitis” and “spineless” in google. 918,000 is the number of hits when you type in “Alberto” and “Boring.” He typed in Otunga’s name and the only thing came up was some stuff about someone named Jennifer Hudson. Punk says that the WWE title isn’t going anywhere then leaves. Otunga calls this a threat. He says that Punk is going to try to get DQ’ed. Ace says that if Punk gets intentionally disqualified, he loses the title.

Wade Barrett comes out as Justin Roberts asks us to “please acknowledge the presence” of him…haha. It appears he will be ringside for the following match.

Match 3: Randy Orton vs. Dolph Ziggler
I miss Dolph’s PERFECTION!!! We get a little squared promo with Dolph saying he’s going to beat Orton here. Lockup to start. Stalemate. Another lockup. Dolph goes for the leg, but Randy gets a side headlock. Ziggler pushes Orton to the ropes and Orton hits a shoulderblock. Whip, Ziggler goes for a hip toss but Orton turns so Ziggler hits a roll up but Orton gets out quickly. Ziggler with a kick then an elbow to the back of the head.orton tosses Ziggler to the corner but Ziggler hops over only to be met with a hard clothesline from Orton. Ziggler quickly rolls out of the ring. Ziggler back in the ring, slowly. We’ve got another lock up and this time Orton hip tosses Ziggler to the mat. Orton stomps each limb but Vickie interrupts halfway. Orton covers for 1..No! Orton wit a suplex then he drops a knee, but Ziggler moves out of the way. Ziggler is up with a kick to Orton’s face and another to the knee. Ziggler with an elbow drop and lands it then pins for 1..2..NO! Ziggler with some rights to Orton then a whip, but Orton goes for a backbreaker, but here’s Ziggler with a roll up for 1…2..NO!!! Ziggler sends Orton to the outside, but Orton is on the apron only to be met with a dropkick from Ziggler. Orton falls to the mat on the outside as Wade Barrett watches on. Ziggler goes outside and starts in on Orton with a right then slams his head to the stairs. Ziggler rolls Orton into the ring then pins for 1…2..NO! Ziggler stomps on Orton into the corner. Ziggler goes for a body splash but Orton moves and Ziggler hits the turnbuckle! Orton with a European uppercut. Again, but Ziggler with a neckbreaker! 1…2…NO! Ziggler with some elbows to the shoulder of Orton as the crowd chants for an RKO. Ziggler goes up top. He’s gonna fly! Wait, Orton is up and hits him with a right, crotching him on the turnbuckle. Orton is there with some headbutts. Orton stares at Barrett before hitting a Superplex from the top rope!! Orton covers 1…2..no!!!!

We are back and Ziggler has the upperhand with some rights. But Orton fights back with some rights! Then Ziggler hits some kicks! Then Orton is back with a kick of his own and some of his clotheslines! Scoop slam! Orton is looking to hit the rope assisted DDT and he does!! Orton is calling for it. He is about to hit it but Ziggler wisely rolls out of the ring. Ziggler tells Vickie, it’s time to go. Wade is dropping the headset. Orton with a dropkick! Ziggler with the Zig Zag from behind!!! Ziggler pins!! 1…2…3!!!!
Winner: Dolph Ziggler (***)
Wasn’t as good as I thought it would be, but still pretty good nonetheless.

Dolph does a headstand for all of our pleasure.

We are back to the show and in the middle of the ring, Michael Cole is introducing “the biggest hypocrite” Daniel Bryan. Cole says Bryan has been given the opportunity to face Henry for the belt. Bryan cuts him off and says he earned the shot. He doesn’t expect Cole to be accurate or be a good announcer. Everyone knows that Cole is the worst announcer in the history of the WWE. But what Bryan does expect is that maybe by now he’s earned some semblance of respect. Especially after last week. Cole says how could he respect a man who tried to cash in his MITB contract against a defenseless World Champ? He’s a liar! He told the world that he was going to wait until Mania to cash in and what did he do?! Bryan says, yes he did say that. Cole calls him a hypocrite. Cole found it hilarious, Bryan attempting to take the title and Cole shows the replay. My thoughts on this entire thing can be seen HERE. But essentially, I didn’t like it and felt that for once, Cole had a point. Let’s see if they can rectify that here.

Back to Raw, Cole says what’s so funny about all of this is that Bryan actually beleived that he was the World Heavyweight Champion, then his dreams were shattered. Luckily, Teddy Long realized that Henry was not medically cleared. If Cole was the GM of Manager, he would have stripped the contract and suspended Bryan indefinitely. Because Daniel Bryan disgusts Michael Cole. He hopes that Mark Henry tears Daniel Bryan apart tomorrow night. Bryan says he is right about one thing, he is a hypocrite. He had plans for this, he had plans to Main Event Wrestlemania, but guess what…plans change. Henry tried to end his career. He realizes that the briefcase doesn’t guarantee him ANYTHING. He saw an opportunity and he took it. He saw one more opportunity and tomorrow night, he’ll be in a Steel Cage! He says that even though his dream is to main event Wrestlemania, what’s more important to him is becoming the World Heavyweight Champion.

Mark Henry is out. Hasn’t he knocked Bryan upside his head enough lately? He oughtta be ashamed of himself for trying to take advantage of a helpless, defenseless man. Who should really be ashamed is Teddy Long for making this match. But thats ok, because Henry is the World’s Strongest Champion and he will defend the World Heavyweight Championship tomorrow on Smackdown. You can talk all you want to down there, Bryan, but whether he’s on two legs, one leg or no legs at all, Bryan can’t beat him. Bryan is walkin up the ramp, kicks Henry in the leg then walks out. haha.

Match 4: Jack Swagger vs. Zack Ryder
We start with Swagger hiting a go-behind into a take down and a couple of smacks to the back of the head. The twitter logo goes crazy again. You gotta admit, it’s a pretty clever idea. Swagger hits Swagger in the corner but Ryder fights out of it. It’s short lived as Swagger hits a belly-to-belly suplex. Swagger with some rights to the back of Ryder until the ref stops him. Swagger with the cover but only gets a 2. Swagger wit a key lock from behind. Swagger attacks with some more hard rights until the ref stops the hold once more and Swagger, once again, with a keylock. Ryder fights out of it, hits the ropes and we get a neckbreaker. Pin for 1…2..NO!! Swagger with a go behind. He locks un a gut wrench, goes for a powerbomb, but Ryder gets out of it! He knocks Swagger down, goes up top and flies but Swagger catches him and hits a backbreaker! Swagger goes for the Swagger bomb, but Ryder grabs his foot. Swagger stomps, goes for the Swagger Bomb again, but Ryder kicks up to the jaw! Ryder is up! Ruff Ryder!!! Pin for the 1…2…3!!!
Winner: Zack Ryder (**1/2)
The match was relatively short, so loses points for that. Swagger continues to bring his wrestling repretoire into the ring and I loves it. Not much else besides that.

Justin Roberts introduces the man that is hosting tomorrow’s Holiday Special (which, coincidentally, is quite early, no?) Mick Foley comes out in Santa garb and wants to share a charming tale. He says, in rhyme, that he has plans come tomorrow night. Sorry, I was distracted, otherwise I’d type out his rendition of Twas the Night Before Christmas. The important part here is that Foley says there will be no Michael Cole! Remember folks, tomorrow night at 8 PM!!

Mathews is with Punk. Punk says that it’s obvious that Johnny Ace is dealing from the bottom of the deck and Johnny Ace can kiss his bottom. And by that he means his ass. And so he doesn’t get intentionally DQ’ed, he says to the camera KISS MY ASS.

Match 5: Alberto Del Rio vs. CM Punk
Lockup! CM Punk works the arm, we get a toss over as he keeps the arm locked. Del Rio with an arm lock of his own. He sends Punk to the floor, working the arm. Punk sends Del Rio to the corner then we get a monkey flip and Punk works the left arm of Del Rio. Del Rio with a side headlock take down. Del Rio hits the ropes then Punk with a shoulder block and a pin for 1. Del Rio is on the arm again. Del Rio sends Punk to the mat then hits the ropes. Punk is up with a leap and a chop to Del Rio. He sends Del Rio to the ropes, Del Rio holds on so Punk clotheslines Del Rio to the outside .Punk dives between the ropes right into the face of Del Rio!

Back, and Del Rio is still working the left arm. He stomps it then covers for 1. Del Rio is quick t grab the arm again, bending it back while Punk is on the floor. Del Rio heelishly grabs the hair but Punk fights out with some eights. He hits the ropes then hopes over for a roll up but Del Rio is too far so Del Rio turns and stomps on Punk. Del Rio goes up top! He flies and hits Punk right in the shoulder! Nice. He pins Punk but only gets a 1. Del Rio slams the arm to the mat then twists it up on the ropes. He’s really workin the arm, here. Del Rio sends Punk to the corner, but Punk kicks out of it. He goes up top and flies for a cross body, but Del Rio moves and Punk falls right on the injured arm. Del Rio with a dropkick and a pin for 1…2..NO! Del Rio attacks from above onto the back of the head of Punk. Del Rio with the arm work again. Punk fights out with some rights. Punk hits the ropes, but Del Rio hits a Tilt-a-Whirl backbreaker!! He pins for 1…2…NO! Del Rio with some knees into the left arm of Punk then a stomp. Del Rio flies off the top with an axe handle and pins for 1…2..NO! Del Rio with a stomp then a pin again! He locks in a key lock but Punk rolls out of it…only for Del RIo to hit a big boot. He pins for 1…2..NO!!! Del Rio up top one more time! This time, Punk with a kick to the side of Del Rio! Punk covers for the 1…2..NO!!! Del Rio with a punch, Punk with a kick, Del Rio with a kick, Punk with a kick, Del Rio with a kick, Punk with a kick, another kick, a—no! Del Rio with some kicks and a punch! Punk hits the ropes. Heel kick. Neckbreaker! 1…2….NO!!! Punk with some high knees. He sends Del Rio to the corner and hits the knee into the bulldog, but just as the bull dog is going, Del Rio with the single armed DDT!! He covers for 1…2..NO!!!!! Del Rio is up. He’s calling for a German but Punk with the go behind. He hits the ropes, Del Rio turns and hits a German Suplex Pin for 1…2..NO WAY JOSE!!!! Whoa! Del Rio is up first again! He signals for the cross arm breaker, Punk turns it into a fireman’s carry, but Del Rio is there with a DDT! Cover for 1…2..NO!!! Lordy, this is great. Del Rio with a hard kick to the back of Punk. Del Rio is working on the turnbuckle, trying to take the cover off. As the ref tries to fix it, Ricardo Rodriguez tosses in a chair! Del Rio grabs it, tosses it to Punk! Punk tosses it back!! The ref sees it!! He is about to call the DQ!! Punk with a quick roll-up for 1…2..NO!!!! Del Rio with a back breaker and a pin!!! 1….2…NO!!!! Del Rio is near the exposed turnbuckle! Punk lifts him up via Fireman’s Carry! Snake Eyes onto the exposed turnbuckle! 1…2….3!!!!
Winner: CM Punk (***1/2)
There were a few small spots that were blown, but the last breath of the match was beautiful. Good job to both men.

Ricardo is trying to argue about what happened here as Punk stands with his belt. Punk grabs Rodriguez and hits the Go To Sleep to end the show.